সর্বশেষ

আল জাজিরার প্রতিবেদন

বাংলাদেশে নির্বাচন: পর্দার আড়ালে কি এখনও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী?

প্রকাশিত: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩০
বাংলাদেশে নির্বাচন: পর্দার আড়ালে কি এখনও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী?

বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থান ও সরাসরি সামরিক শাসনের অধ্যায় আপাতত অতীত হলেও রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি—এমন মূল্যায়ন করছেন বিশ্লেষকেরা। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সেনাবাহিনী দৃশ্যত ক্ষমতা দখলের পথে না গেলেও তারা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে।

 

ঢাকার রাজনৈতিক আলোচনায় সাম্প্রতিক সময়ে ‘কচুক্ষেত’ শব্দটি নতুন এক প্রতীকী অর্থ পেয়েছে। সেনানিবাস ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার অবস্থান হওয়ায় কচুখেত এখন অনেকের কাছে বেসামরিক রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব বোঝানোর এক ধরনের শর্টহ্যান্ড হয়ে উঠেছে।

 

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালের আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনের অবসান এবং নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এই প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছে না। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘দৃশ্যমান রক্ষক’ হিসেবে তারা নির্বাচনী পরিবেশে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর পুলিশ বাহিনী মনোবল ও সক্ষমতার দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ায় দীর্ঘ দেড় বছর ধরে সেনাসদস্যরা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে রয়েছে। নির্বাচনের সময় এই মোতায়েন আরও বাড়বে বলে জানানো হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, সারাদেশে প্রায় এক লাখ সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং সেনাবাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে।

 

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশ ও মিয়ানমারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক থমাস কিয়ান আল জাজিরাকে বলেন, সেনাবাহিনী শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, দৈনন্দিন নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘ব্যাকস্টপ’ দিচ্ছে। তাঁর মতে, সেনাবাহিনী একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দ্রুত সাংবিধানিক ধারায় ফেরার পক্ষেই রয়েছে, যাতে তারা ব্যারাকে ফিরে যেতে পারে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ শাহানের মতে, সেনাবাহিনীর বর্তমান প্রভাব সরাসরি ক্ষমতা দখলের চেয়ে বেশি ‘প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত’। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর ভেতর দিয়ে, পাশাপাশি অবকাঠামো প্রকল্প, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় সংস্থায় অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত কর্মকর্তাদের উপস্থিতির মাধ্যমে এই প্রভাব বজায় আছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও সুযোগ-সুবিধার অংশীদার হয়েছিল, যা ভবিষ্যত সরকারগুলোর ওপরও অনানুষ্ঠানিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

 

২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় সেনাবাহিনীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছালেও তারা বেসামরিক জনগণের ওপর গুলি চালায়নি এবং পূর্ণমাত্রায় কারফিউ কার্যকর করেনি। বরং শেখ হাসিনাকে নিরাপদে দেশ ছাড়ার সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের পথ উন্মুক্ত হয়। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তখন বলেছিলেন, সেনাবাহিনীর কাজ রাজনীতি নয় এবং তারা বেসামরিক নাগরিকের ওপর অস্ত্র তাক করে না।

 

তবে ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে সেনাবাহিনী একসময় সরাসরি ক্ষমতায় ছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর একের পর এক অভ্যুত্থান, জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন দেশটির রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ২০০৭ সালেও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল।

 

আল জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক দমননীতির অভিযোগে এখন কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বেসামরিক আদালতে বিচার চলছে, যা বাংলাদেশে নজিরবিহীন এবং বেসামরিক-সামরিক সম্পর্কে এক স্পর্শকাতর অধ্যায় তৈরি করেছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনী ভবিষ্যতেও একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই থাকবে। তবে গণতন্ত্র টেকসই করতে হলে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে নিরাপত্তা বাহিনী আর কখনোই দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এটাই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সব খবর

আরও পড়ুন

গণপরিষদ, সংবিধান সংস্কার ও ‘১৮০ কার্যদিবস’ নিয়ে বিভ্রান্তি

ভোটে জয় মানেই সরকার গঠন নয় গণপরিষদ, সংবিধান সংস্কার ও ‘১৮০ কার্যদিবস’ নিয়ে বিভ্রান্তি

বাজার অস্থিরতার মাঝেই ফের বাড়লো এলপিজি গ্যাসের দাম

১২ কেজি সিলিন্ডার ১,৩৫৬ টাকা বাজার অস্থিরতার মাঝেই ফের বাড়লো এলপিজি গ্যাসের দাম

শেষ মুহুর্তে গোঁজামিলের বিতর্কিত প্রকল্প নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার

চাপ বাড়বে নির্বাচিত সরকারের ওপর শেষ মুহুর্তে গোঁজামিলের বিতর্কিত প্রকল্প নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার

দুদক সংস্কারে অন্তত সাত উপদেষ্টার আপত্তি: ড. ইফতেখারুজ্জামান

দুদক সংস্কারে অন্তত সাত উপদেষ্টার আপত্তি: ড. ইফতেখারুজ্জামান

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি একের পর এক সিদ্ধান্ত

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও ব্যয় নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি একের পর এক সিদ্ধান্ত

নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর বিবৃতি নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক

কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ছে

রয়টার্সের প্রতিবেদন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ছে

নির্বাচন পর্যবেক্ষণে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে ইসি

১৭ সংস্থা থেকে ৬৪ শতাংশ পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে ইসি