অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে এসে একের পর এক দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, বড় ব্যয় অনুমোদন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য বড় আর্থিক ও রাজনৈতিক দায় তৈরি করবে যার দায়ভার বহনের ক্ষেত্রে তাদের কোনো ভূমিকা থাকছে না।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালের কার্গো কার্যক্রম পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি। এর আগে গত নভেম্বরে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে ৫৫০ মিলিয়ন ডলারে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ৩৩ বছরের চুক্তি করা হয়। একই সময়ে সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ ২২ বছরের জন্য পানগাঁও নদীবন্দর পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মেডলগের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্রের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলেও লালদিয়া ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তিতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণকে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন অনেক অর্থনীতিবিদ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে দেশকে বহু বিলিয়ন ডলারের দায়ে আবদ্ধ করা নীতিগতভাবে অনৈতিক। তাঁর মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য অর্থনীতি পরিচালনা আরও কঠিন করে তুলবে।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদও এসব চুক্তিতে স্বচ্ছতার ঘাটতির কথা উল্লেখ করে বলেন, শেষ মুহূর্তে রাজনৈতিক দল ও জনগণের মতামত উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া পতিত শাসনামলের চর্চাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী সরকার যে গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, বাস্তবে তারা সেই নীতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক আচরণ করছে।
বন্দর চুক্তির পাশাপাশি সরকার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টিসহ ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। একই সঙ্গে ১১৮ জন ঊর্ধ্বতন আমলাকে পদোন্নতি এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, এই বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারি ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে, যা দুর্বল কোষাগারের জন্য বড় ঝুঁকি।
এছাড়া একনেক সম্প্রতি ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে ২৫টি নতুন ও সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে ব্যয় ও সময় বাড়ানো অন্যতম। নির্বাচনের আগে র্যাবের জন্য সরাসরি ক্রয়ে ১৬৩টি যানবাহন কেনার সিদ্ধান্ত এবং ২০২৬–২৭ অর্থবছরের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ নিয়েও সমালোচনা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের দায়িত্বে থাকা একটি অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল দৈনন্দিন প্রশাসন ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় মনোযোগ দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে শেষ সময়ে নেওয়া এসব দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি জটিল ও ভারী উত্তরাধিকার হয়ে উঠছে।