সর্বশেষ

কোটিপতি প্রার্থীর বিস্ফোরণ, অর্থনীতির দখলে রাজনীতি

মোট প্রার্থীদের ৪৫ শতাংশ এবং বিএনপির ৮৩ শতাংশই কোটিপতি

প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:৫৬
মোট প্রার্থীদের ৪৫ শতাংশ এবং বিএনপির ৮৩ শতাংশই কোটিপতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পদসংক্রান্ত চিত্র বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে এক গভীর কাঠামোগত সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৯১ জন, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। শতকোটির বেশি সম্পদের মালিক প্রার্থী আছেন অন্তত ২৭ জন। অর্থাৎ, রাজনীতি ক্রমেই সাধারণ নাগরিকের প্রতিনিধিত্বের জায়গা থেকে সরে গিয়ে উচ্চবিত্তের একচেটিয়া ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

 

টিআইবির তথ্যমতে, অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় মোট ১ হাজার ৯৮১ প্রার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশই কোটিপতি। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে কোটিপতির হার সবচেয়ে বেশি। দলটির ৮৩ শতাংশ প্রার্থী কোটিপতি এবং শতকোটির মালিক অন্তত সাতজন। শতকোটি টাকার মালিকদের মধ্যে বিএনপির প্রার্থী ১৮ জন এবং ৯ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। অবশ্য স্বতন্ত্র এই প্রার্থীদের মধ্যে অন্তত দুজনের মনোনয়ন প্রত্যাহার হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

 

বিএনপির শতকোটি মালিক ১৮ প্রার্থীর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ–২ আসনের মো. আমিনুল ইসলামের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ৬২০ কোটি টাকা, ফেনী-৩ আসনের আবদুল আউয়াল মিন্টুর ৬০৭ কোটি টাকার বেশি, কুষ্টিয়া-৩ আসনের মো. জাকির হোসেন সরকারের ৫৮১ কোটির বেশি, চট্টগ্রাম-৪ আসনের মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর প্রায় ৪৭৩ কোটি টাকা, ময়মনসিংহ-১১ আসনের ফখর উদ্দিন আহমেদের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা, কুমিল্লা-৮ আসনের জাকারিয়া তাহেরের ২৯২ কোটি টাকার বেশি, বগুড়া-৫ আসনের গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের ২৫৬ কোটি টাকার বেশি, চাঁদপুর-২ আসনের মো. জালাল উদ্দিনের ২৩১ কোটি টাকার বেশি, শরীয়তপুর-২ আসনের মো. সফিকুর রহমান কিরণের প্রায় ১৮৬ কোটি টাকা, চাঁদপুর-৪ আসনের মো. হারুনুর রশীদের ১৭৫ কোটি টাকার বেশি, ঢাকা-৭ আসনের হামিদুর রহমানের ১৬১ কোটি টাকার বেশি, মৌলভীবাজার-৩ আসনের নাসের রহমানের প্রায় ১৪২ কোটি টাকা, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির ১১৪ কোটি টাকার বেশি, শরীয়তপুর–১ আসনের সাঈদ আহমেদের ১১১ কোটি টাকার বেশি, ঢাকা-৮ আসনের মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদের (মির্জা আব্বাস) ১০৯ কোটির বেশি, মানিকগঞ্জ-৩ আসনের আফরোজা খানমের প্রায় ১০৭ কোটি টাকা, চুয়াডাঙ্গা–২ আসনের মাহমুদ হাসান খানের প্রায় ১০৪ কোটি টাকা এবং রংপুর-৪ আসনের মোহাম্মদ এমদাদুল হক ভরসার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মূল্য ১০০ কোটি টাকার বেশি।

 

অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের এস এস কে একরামুজ্জামানের (প্রার্থিতা প্রত্যাহার) সম্পদের মূল্য ৪৯৯ কোটি টাকার বেশি, টাঙ্গাইল-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাহউদ্দিন আলমগীরের ২৮৩ কোটি টাকার বেশি, বাগেরহাট-১ ও ২ আসনের এম এ এইচ সেলিমের প্রায় ২৬৩ কোটি টাকা, নোয়াখালী-৬ আসনের মোহাম্মদ ফজলুল আজিমের ১৮৮ কোটি টাকার বেশি, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের মো. শাহ আলমের প্রায় ১৮৫ কোটি টাকা, নরসিংদী-৫ আসনের জামাল আহমেদ চৌধুরীর ১৬০ কোটি, শরীয়তপুর-২ আসনের ফারহানা কাদির রহমানের ১৫৯ কোটি টাকার বেশি, কুমিল্লা–৬ আসনের মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের ১২৯ কোটি (প্রার্থিতা প্রত্যাহার), চাঁদপুর-৪ আসনের মো. আবদুল হান্নানের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১২১ কোটি টাকা।

 

কোটিপতি প্রার্থীর সংখ্যার এই বৃদ্ধি গত দেড় দশকের ধারাবাহিক প্রবণতার চূড়ান্ত রূপ। তুলনামূলক পরিসংখ্যান বলছে—

  • ২০০৮ সালে কোটিপতি ছিলেন ২৭৪ জন (মোট প্রার্থীর ১৭%)
  • ২০১৪ সালে ২০২ জন (৩৭%)
  • ২০১৮ সালে ৫২২ জন (২৭%)
  • ২০২৪ সালে ৫৭১ জন (২৭%)
  • ২০২৬ সালে ৮৯১ জন (প্রায় ৪৫%)

 

এই তথ্য স্পষ্টভাবে দেখায়, কেবল সংখ্যাই বাড়েনি বরং রাজনীতিতে অর্থশক্তির প্রভাব বহুগুণে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মাত্র দুই বছরে কোটিপতির সংখ্যা প্রায় ৩২০ জন বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্বাচনী ব্যবস্থায় অর্থের আধিপত্যকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে। আবার এই কোটিপতিদের অনেকের আয়েও অস্বচ্ছতা, গড়মিল দেখা গিয়েছে। পূর্বের নির্বাচনের হলফনামা এবং বার্ষিক ট্যাক্স রিটার্নের তথ্যের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় অনেকেরই সম্পত্তি গত দেড় বছরে কোনো এক আলাদীনের প্রদীপের বলে কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। 

 

শুধু সম্পদ নয়, নির্বাচনী ব্যয়েও বিপুল অস্বচ্ছতা রয়ে গেছে। এবারের নির্বাচনে সব প্রার্থীর ঘোষিত মোট ব্যয় ৪৬৩.৭ কোটি টাকা, গড় ব্যয় ২২.৫ লাখ টাকা। সবচেয়ে বেশি ব্যয় দেখিয়েছে বিএনপি ১১৯.৫ কোটি টাকা। তবে টিআইবিসহ বিশ্লেষকদের মতে, ঘোষিত ব্যয় বাস্তব ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম দেখানো হয়, যা নির্বাচনী অর্থায়নে জবাবদিহির ঘাটতি নির্দেশ করে।

 

ঋণসংক্রান্ত তথ্য আরও উদ্বেগজনক। মোট প্রার্থীর সাড়ে ২৫ শতাংশের কোনো না কোনো ঋণ রয়েছে। প্রার্থীদের সম্মিলিত ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে ব্যাংকঋণই ১৭ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, যাঁরা আইন প্রণয়ন করবেন, তাঁদের বড় অংশই ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

 

আইনি জটিলতাও নির্বাচনের চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বর্তমানে ৫৩০ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, যা মোট প্রার্থীর ২২.৬৬ শতাংশ। অতীতে মামলা ছিল ৭৪০ জনের বিরুদ্ধে। যদিও সংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবু প্রতি পাঁচজন প্রার্থীর একজন কোনো না কোনো ফৌজদারি মামলার আসামি—এটি গণতন্ত্রের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

 

পেশাগত ও সামাজিক গঠনেও রাজনীতির শ্রেণিচরিত্র স্পষ্ট। ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থী ব্যবসায়ী। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন মাত্র ১.৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ, রাজনীতি আর পেশাগত রাজনীতিকদের ক্ষেত্র নয়, বরং ব্যবসায়িক শ্রেণির বিনিয়োগক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

 

নারীর অংশগ্রহণ আরও করুণ। মোট প্রার্থীর মাত্র ৪.০২ শতাংশ নারী—৫ শতাংশের সাংবিধানিক লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয়নি। অন্যদিকে, ইসলামপন্থি দলগুলোর প্রার্থী বেড়ে মোট প্রার্থীর ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা গত পাঁচ নির্বাচনের মধ্যে সর্বোচ্চ।

 

এই প্রেক্ষাপটে কোটিপতি প্রার্থীর বিস্ফোরণ কেবল সম্পদের পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির শ্রেণিভিত্তিক রূপান্তরের দলিল। সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনীতিতে প্রবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে অর্থশালী গোষ্ঠীর হাতে যা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের মৌলিক ধারণাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

সব খবর

আরও পড়ুন

গণপরিষদ, সংবিধান সংস্কার ও ‘১৮০ কার্যদিবস’ নিয়ে বিভ্রান্তি

ভোটে জয় মানেই সরকার গঠন নয় গণপরিষদ, সংবিধান সংস্কার ও ‘১৮০ কার্যদিবস’ নিয়ে বিভ্রান্তি

বাজার অস্থিরতার মাঝেই ফের বাড়লো এলপিজি গ্যাসের দাম

১২ কেজি সিলিন্ডার ১,৩৫৬ টাকা বাজার অস্থিরতার মাঝেই ফের বাড়লো এলপিজি গ্যাসের দাম

শেষ মুহুর্তে গোঁজামিলের বিতর্কিত প্রকল্প নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার

চাপ বাড়বে নির্বাচিত সরকারের ওপর শেষ মুহুর্তে গোঁজামিলের বিতর্কিত প্রকল্প নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার

দুদক সংস্কারে অন্তত সাত উপদেষ্টার আপত্তি: ড. ইফতেখারুজ্জামান

দুদক সংস্কারে অন্তত সাত উপদেষ্টার আপত্তি: ড. ইফতেখারুজ্জামান

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি একের পর এক সিদ্ধান্ত

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও ব্যয় নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি একের পর এক সিদ্ধান্ত

নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর বিবৃতি নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক

বাংলাদেশে নির্বাচন: পর্দার আড়ালে কি এখনও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী?

আল জাজিরার প্রতিবেদন বাংলাদেশে নির্বাচন: পর্দার আড়ালে কি এখনও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী?

কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ছে

রয়টার্সের প্রতিবেদন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ছে