জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র কদিন আগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৪ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক নিয়োগে অস্বাভাবিক তাড়াহুড়া নিয়ে দেশজুড়ে প্রশ্ন ও সন্দেহ দানা বাঁধছে। গত ২১ জানুয়ারি লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর ২৮ জানুয়ারি থেকে মৌখিক পরীক্ষা শুরু এবং ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরিকল্পনা করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। অথচ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
সূত্র জানায়, প্রতিটি জেলায় মৌখিক পরীক্ষা বোর্ডের সভাপতি জেলা প্রশাসক (ডিসি)। অথচ নির্বাচনকালীন সময়ে ডিসিরাই মাঠ প্রশাসনের মূল সমন্বয়ক ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। নির্বাচনী প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রার্থীদের অভিযোগ নিষ্পত্তি—সব মিলিয়ে ডিসিরা এখন চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন। একইভাবে মৌখিক পরীক্ষার সদস্যসচিব জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারাও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এমন বাস্তবতায় বিপুলসংখ্যক নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ১৫ দিন আগে এত বড় নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা প্রশাসনিক যুক্তির বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক হিসাবের ইঙ্গিত দেয়। ডিসিরা সময় দিতে না পারলে মৌখিক পরীক্ষার নিয়ন্ত্রণ কার্যত এডিসি ও নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তাদের হাতে চলে যাবে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গা আরও দুর্বল হবে। ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে নিয়োগ বাণিজ্য, তদবির ও সিন্ডিকেট সক্রিয় হওয়ার গুঞ্জন ছড়িয়েছে।
এবারের নিয়োগে মৌখিক পরীক্ষার কাঠামোতেও আনা হয়েছে বিতর্কিত পরিবর্তন। ভাইভা নম্বর ২০ থেকে কমিয়ে ১০ করা হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো ভাইভায় পাস-ফেল সংযোজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সার্টিফিকেটের জন্য নম্বর বাতিল করা হয়েছে, যা যেকোনো নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিরল। বোর্ডে অধিদপ্তরের প্রতিনিধি যুক্ত করা হয়েছে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়।
এর আগে ৯ জানুয়ারির লিখিত পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস ও ডিজিটাল জালিয়াতির অভিযোগে সারা দেশে দুই শতাধিক ব্যক্তি আটক হন। ব্লু-টুথ ডিভাইস, প্রক্সি পরীক্ষার্থী ও ইলেকট্রনিক জালিয়াতির ঘটনায় কয়েক হাজার পরীক্ষার্থী পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। কিন্তু সেই দাবিকে উপেক্ষা করে দ্রুত ফল প্রকাশ ও ভাইভা শুরুর সিদ্ধান্ত নেয় অধিদপ্তর। সমালোচকদের মতে, লিখিত পরীক্ষার বিতর্ক ম্লান করতেই দ্রুত মৌখিক পরীক্ষা শেষ করার চেষ্টা চলছে।
এ প্রক্রিয়ায় আরও একটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে এসেছে। দেশে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রায়শই প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনের ঠিক আগে বিপুলসংখ্যক নতুন শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসন কি ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করতে চাচ্ছে? রাজনৈতিকভাবে অনুগত বা পক্ষপাতদুষ্ট প্রার্থীদের নিয়োগ দিয়ে নির্বাচন পরিচালনায় সুবিধা নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা কি এর পেছনে রয়েছে—এ প্রশ্ন এখন নীতিনির্ধারক মহলে আলোচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “নির্বাচনের পর ভাইভা হলে অনেক পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করা যেত না। এখন সবার দৃষ্টি নির্বাচনের দিকে, তাই অনিয়ম হলেও তা চাপা পড়ে যাবে।”
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দাবি করেছেন, দ্রুততার কারণ প্রশাসনিক। তবে বাস্তবতা হলো—নির্বাচনের ঠিক আগে নিয়োগ তৎপরতা, পরিবর্তিত মূল্যায়ন কাঠামো এবং অতীতের জালিয়াতির ইতিহাস মিলিয়ে এই প্রক্রিয়া নিয়োগের চেয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিতই বেশি দিচ্ছে।