সর্বশেষ

সরকারের অদক্ষতায় জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে

আওয়ামী লীগের করা হাজার কোটি টাকার পাইপলাইন ও মজুত সক্ষমতা ফেলে রেখেছে সরকার

জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০০:৫৩
আওয়ামী লীগের করা হাজার কোটি টাকার পাইপলাইন ও মজুত সক্ষমতা ফেলে রেখেছে সরকার

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বহুল আলোচিত ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং’ (এসপিএম) প্রকল্প যার লক্ষ্য ছিল সাগর থেকে সরাসরি পাইপলাইনে তেল খালাস ও দ্রুত পরিবহন, দুই বছর ধরে প্রায় অচল অবস্থায় পড়ে আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আট হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই বিশাল অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও কেবল অপারেটর নিয়োগের জটিলতায় তা চালু করা যায়নি। ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্র হারাচ্ছে বছরে সম্ভাব্য শত শত কোটি টাকার সাশ্রয়, অন্যদিকে তেল সংকটের সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধাও হাতছাড়া হচ্ছে।

 

কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত এই প্রকল্পের আওতায় বঙ্গোপসাগরে ভাসমান বয়া, প্রায় ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন এবং দুই লাখ টন তেল সংরক্ষণের সক্ষমতাসম্পন্ন ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংক তৈরি করা হয়েছে। এই অবকাঠামো ব্যবহার করে গভীর সমুদ্র থেকে বড় ট্যাংকার জাহাজের তেল সরাসরি পাইপলাইনে এনে মহেশখালী হয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পাঠানোর কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও আওয়ামী লীগ সরকারের করা এই আধুনিক ব্যবস্থাটি কার্যকর না হওয়ায় বাংলাদেশ এখনও পুরনো, ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ লাইটারেজ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করছে।

 

বর্তমান ব্যবস্থায় বড় জাহাজ থেকে তেল ছোট জাহাজে করে খালাস করে কর্ণফুলী চ্যানেল দিয়ে রিফাইনারিতে পৌঁছাতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং অপচয়প্রবণ। যেখানে এসপিএম চালু থাকলে এক লাখ টন তেল খালাসে সময় লাগত মাত্র ৪৮ ঘণ্টা, সেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে লাগে প্রায় ১১ দিন। শুধু সময়ই নয়, এই বিলম্বের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন ক্ষতি এবং পরিবেশগত ঝুঁকি।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পটি কেবল একটি অবকাঠামো নয় বরং এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি কৌশলগত স্তম্ভ হতে পারত। মহেশখালীর ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংকে যে দুই লাখ টন তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তা সংকটকালে একটি কার্যকর ‘স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ’ হিসেবে ব্যবহার করা যেত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সক্ষমতা এখনো পুরোপুরি অব্যবহৃত।

 

 

প্রশ্ন উঠছে কেন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চালু করা গেল না? এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নীতিগত অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছিল বিশেষ আইনের আওতায়, যেখানে দরপত্র ছাড়াই চুক্তি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই বিশেষ আইন বাতিল হলে অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্ধারিত ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। নতুন করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হলেও তা চূড়ান্ত করতে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়।

 

এখানেই মূল সমালোচনা। একটি প্রকল্প যখন প্রায় সম্পন্ন পর্যায়ে, তখন তার অপারেশনাল কাঠামো নিশ্চিত না করে নির্মাণ শেষ করা এটি পরিকল্পনার বড় ধরনের দুর্বলতা নির্দেশ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প গ্রহণের সময়ই অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের রূপরেখা নির্ধারণ করা উচিত ছিল। তা না করে পরে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে পুরো প্রকল্পকে অচল করে রাখা প্রশাসনিক ব্যর্থতারই প্রমাণ।

 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এই বিলম্ব শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং এটি একটি সুযোগহানিও। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার সময়ে দ্রুত আমদানি ও মজুত সক্ষমতা একটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসপিএম চালু থাকলে বাংলাদেশ তেল আমদানিতে সময় ও ব্যয় কমাতে পারত, পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খলে স্থিতিশীলতা আনতে পারত।

 

অন্যদিকে, লাইটারেজ পদ্ধতিতে তেল পরিবহনের সময় যে পরিমাণ ‘লস’ বা অপচয় ঘটে, সেটিও একটি বড় বিষয়। পাইপলাইনে সরাসরি পরিবহন করলে এই ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসত। পাশাপাশি এটি পরিবেশবান্ধব একটি পদ্ধতি, যেখানে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় দূষণও কম হয়।

 

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া এখনো চলছে এবং দ্রুতই প্রকল্পটি চালু করা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই “দ্রুত” কতটা দ্রুত? দুই বছর ধরে পড়ে থাকা একটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই ধরনের আশ্বাস জনসাধারণের আস্থা কতটা পুনরুদ্ধার করতে পারবে, সেটি নিয়েও সংশয় রয়েছে।

 

এছাড়া, এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঋণের চাপ। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহার না করেও তার আর্থিক দায় বহন করতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে। অর্থাৎ, প্রকল্পটি চালু না থাকলেও এর জন্য অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে যা কার্যত দ্বিগুণ ক্ষতির শামিল।

 

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা জবাবদিহির দাবি তুলেছেন। কেন সময়মতো অপারেটর নিয়োগ করা গেল না, কেন নীতিগত পরিবর্তনের ঝুঁকি আগেই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি, এবং কেন একটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবকাঠামো দুই বছর ধরে অচল পড়ে আছে এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

 

সবশেষে বলা যায়, এসপিএম প্রকল্পটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হলেও, এর বাস্তবায়ন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় যে শৈথিল্য দেখা গেছে, তা উদ্বেগজনক। দ্রুত সিদ্ধান্ত, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ছাড়া এই ধরনের বড় প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। এখন দেখার বিষয় সরকার কত দ্রুত এই অচলাবস্থা কাটিয়ে প্রকল্পটিকে কার্যকর করতে পারে।

সব খবর

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে যাবে ১২ লাখ মানুষ, নতুন করে দরিদ্র হবেন প্রায় ১৪ লাখ

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব নিয়ে বিশ্বব্যাংকের শঙ্কা বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে যাবে ১২ লাখ মানুষ, নতুন করে দরিদ্র হবেন প্রায় ১৪ লাখ

ইউনূস-নূরজাহানের জবাবদিহিতা ও বিচারের দাবিতে তীব্র জনমত

টিকাদানে অবহেলায় শিশু মৃত্যুতে ক্ষোভ ইউনূস-নূরজাহানের জবাবদিহিতা ও বিচারের দাবিতে তীব্র জনমত

উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও কেন দীর্ঘ লাইন ও ভোগান্তি?

বাংলাদেশে পেট্রোল-অকটেন সংকট উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও কেন দীর্ঘ লাইন ও ভোগান্তি?

নতুন দামে আরও চাপে মধ্যবিত্ত

এলপিজির দামে বড় লাফ নতুন দামে আরও চাপে মধ্যবিত্ত

ব্যবসায়ীদের রাত ৮টার সিদ্ধান্তের পর সরকার নির্ধারণ করল সন্ধ্যা ৬টা

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে দোকানপাটের সময়সীমা আরও কমলো ব্যবসায়ীদের রাত ৮টার সিদ্ধান্তের পর সরকার নির্ধারণ করল সন্ধ্যা ৬টা

‘তেলের মজুদ শেষ হওয়া প্রথম দেশ’ হওয়ার শঙ্কায় বাংলাদেশ

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদন ‘তেলের মজুদ শেষ হওয়া প্রথম দেশ’ হওয়ার শঙ্কায় বাংলাদেশ

‘অস্পষ্ট বিবৃতি নয়, আগ্রাসনের নিন্দা করুক বাংলাদেশ’: ইরানি রাষ্ট্রদূত

‘অস্পষ্ট বিবৃতি নয়, আগ্রাসনের নিন্দা করুক বাংলাদেশ’: ইরানি রাষ্ট্রদূত

নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে ৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা

নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে ৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা