সর্বশেষ

প্রতিশ্রুতি ছিল স্বচ্ছতার, বাস্তবে নীরবতা

দেড় বছরেও ইউনূস সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব পাওয়া যায়নি

প্রকাশিত: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩০
দেড় বছরেও ইউনূস সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব পাওয়া যায়নি

ক্ষমতায় বসেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ আর স্বচ্ছতার বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, “সকল উপদেষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন।” সেই ঘোষণায় তখন অনেকেই ভেবেছিলেন বাংলাদেশে হয়তো নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি শুরু হতে যাচ্ছে।

 

কিন্তু দেড় বছর পার হয়ে গেলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। একজন উপদেষ্টারও সম্পদের হিসাব জনসম্মুখে আসেনি। প্রশ্ন উঠছে, প্রতিশ্রুতি কি শুধু বক্তৃতার শব্দ ছিল?

 

 

সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেছিল, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার জবাবদিহিতার একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, কথায় স্বচ্ছতা কিন্তু কাজে গোপনীয়তা।

 

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এই ব্যর্থতা “দুঃখজনক”। যারা জবাবদিহিতার কথা বলে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তাদের কাছ থেকে এমন অস্বচ্ছতা জনগণ প্রত্যাশা করেনি। ইউনূস সরকারের অতি আপনজন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যও সতর্ক করেছেন যে এভাবে সম্পদের হিসাব গোপন রাখা ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

 

 

অর্থাৎ, এই সরকারের আচরণই আগামী দিনের মন্ত্রী-আমলাদের জন্য অজুহাত হয়ে দাঁড়াবে যে “ওরাও তো প্রকাশ করেনি, আমরা কেন করবো?”

প্রশ্নটা আরও তীক্ষ্ণ হচ্ছে নীতিমালার দিকে তাকালে। ২০২৪ সালের অক্টোবরেই সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে উপদেষ্টাদের আয়-সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে। সেখানে স্পষ্ট বলা আয়কর রিটার্নের পর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে, আর প্রধান উপদেষ্টা তা প্রকাশ করবেন।

 

তাহলে প্রকাশ হলো না কেন?

 

এখানেই সন্দেহের শুরু। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ সরাসরি বলেছেন এটি হয়তো “লোকদেখানো স্টান্টবাজি” ছিল। যদি তথ্য পরিষ্কার থাকে, প্রকাশে ভয় কিসের? নাকি প্রকাশ করলে অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠবে? এই সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক অভিযোগ।

 

 

সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই সাবেক সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার প্রকাশ্যে অন্তত আটজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে “সীমাহীন দুর্নীতি”র অভিযোগ তোলেন। তার দাবি ছিল গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও বদলিতে উপদেষ্টাদের ‘যোগাযোগ’ ছাড়া কিছু হয় না। সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তদন্ত? নেই।

 

পরে সামাজিক মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেত্রী শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদাবাজির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম জড়ায়। তিনি অস্বীকার করেন, কিন্তু স্বাধীন তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি আজও নেই।

 

আরও বিস্ময়কর, উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও সহকারীদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়ে কয়েকজনকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে একজন উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা যদি দুর্নীতিতে জড়ায়, দায় কি শুধু তার একার?

টিআইবি বলছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা দায় এড়াতে পারেন না।

 

 

তারপরও যেন সরকারের ভেতরে এক ধরনের ‘অস্বীকার সংস্কৃতি’ কাজ করছে। অভিযোগ এলেই অস্বীকার, সমালোচনা এলেই চুপ।

 

এর মধ্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে গ্রামীণ ইস্যু। ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংককে কর অব্যাহতি, সরকারের শেয়ার কমানো, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, ডিজিটাল ওয়ালেট লাইসেন্স—সব মিলিয়ে “স্বার্থের দ্বন্দ্ব” নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকেরা। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নিজের প্রতিষ্ঠানের এমন সুবিধা পাওয়া নৈতিকতার পরীক্ষায় কতটা উত্তীর্ণ সেটার জবাব কেউ দিচ্ছেন না।

 

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের ভাষায়, “ক্ষমতায় থাকাটাই প্রভাব বিস্তারের জন্য যথেষ্ট।” অর্থাৎ প্রভাব প্রমাণ করতে কাগজ লাগে না, পরিস্থিতিই অনেক কিছু বলে দেয়।

 

উপদেষ্টারা অবশ্য দাবি করছেন, তারা সম্পদের বিবরণী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছেন। কিন্তু জনগণ দেখবে কবে? এই ‘জমা দিয়েছি, প্রকাশ করবো না’ যুক্তি কার্যত স্বচ্ছতার পরিপন্থী। জনগণের করের টাকায় চলা সরকারের সম্পদের হিসাব জনগণ জানবে না এ কেমন জবাবদিহিতা?

 

 

সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম হলফনামায় নিজের সম্পদের তথ্য প্রকাশ করেছেন। যদিও সেখানে স্বচ্ছতা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে এবং দায়সারা সে হিসাব নির্বাচনী বাধ্যবাধকতার কারণে শুধু। আর বাকিদের সম্পদের হিসাব এখনও আড়ালে।

 

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের পথে। এখনো যদি তারা সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করে বিদায় নেয়, তাহলে এই সরকারের ‘নৈতিক উচ্চতা’ নিয়ে সব দাবি ভেঙে পড়বে। যে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলে এসেছে, তাদের নিজেদের সম্পদের হিসাব গোপন রাখা নিছক দ্বিচারিতা নয় কেবল, এটি জনগণের সঙ্গেও প্রতারণা।

 

শেষ মুহূর্তে হলেও সুযোগ আছে। প্রকাশ করুন ক্ষমতায় আসার সময় কত ছিল, আর এখন কত আছে। না হলে ইতিহাস বলবে, প্রতিশ্রুতি ছিল স্বচ্ছতার, বাস্তবে ছিল প্রতারণার দেয়াল।

সব খবর

আরও পড়ুন

গণপরিষদ, সংবিধান সংস্কার ও ‘১৮০ কার্যদিবস’ নিয়ে বিভ্রান্তি

ভোটে জয় মানেই সরকার গঠন নয় গণপরিষদ, সংবিধান সংস্কার ও ‘১৮০ কার্যদিবস’ নিয়ে বিভ্রান্তি

বাজার অস্থিরতার মাঝেই ফের বাড়লো এলপিজি গ্যাসের দাম

১২ কেজি সিলিন্ডার ১,৩৫৬ টাকা বাজার অস্থিরতার মাঝেই ফের বাড়লো এলপিজি গ্যাসের দাম

শেষ মুহুর্তে গোঁজামিলের বিতর্কিত প্রকল্প নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার

চাপ বাড়বে নির্বাচিত সরকারের ওপর শেষ মুহুর্তে গোঁজামিলের বিতর্কিত প্রকল্প নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার

দুদক সংস্কারে অন্তত সাত উপদেষ্টার আপত্তি: ড. ইফতেখারুজ্জামান

দুদক সংস্কারে অন্তত সাত উপদেষ্টার আপত্তি: ড. ইফতেখারুজ্জামান

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি একের পর এক সিদ্ধান্ত

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও ব্যয় নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি একের পর এক সিদ্ধান্ত

নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর বিবৃতি নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক

বাংলাদেশে নির্বাচন: পর্দার আড়ালে কি এখনও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী?

আল জাজিরার প্রতিবেদন বাংলাদেশে নির্বাচন: পর্দার আড়ালে কি এখনও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী?

কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ছে

রয়টার্সের প্রতিবেদন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ছে