স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিস সংস্কারে অন্তত ২০ বার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে কমিশন ও টাস্কফোর্স গঠন করে নিয়োগ, পদোন্নতি, বেতন কাঠামো এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উদ্যোগের বড় অংশ বাস্তবায়ন হয়নি। শুধু বেতন কাঠামো নিয়মিতভাবে পরিবর্তন করা হলেও সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি কমেনি।
এখন পর্যন্ত আটটি বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছে। নবম কমিশনের প্রস্তাব এখনো কার্যকর হয়নি। ২০১৫ সালে নতুন বেতন কাঠামো চালু হলে বলা হয়েছিল দুর্নীতি কমবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, দুর্নীতি কমার পরিবর্তে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা বেড়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দুর্নীতির ১৫৩টি মামলায় ৪৭৭ জন অভিযুক্ত হয়েছেন, এর মধ্যে ১৪৪ জন ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ বছরে ঘুষের বিপুল অঙ্ক আমলাদের কাছে গেছে। প্রতিবেদনে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলাদের মধ্যে অনৈতিক চক্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও জানিয়েছে, ২০২৩ সালে ৭০ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে এবং ঘুষের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৯০২ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুর্নীতি কমাতে শুধু বেতন বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিকে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি করলে শাস্তি এবং ভালো কাজ করলে প্রণোদনা দিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাদিক হাসানও বলেন, দুর্নীতি কমাতে মূল চাবিকাঠি হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।
অতীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার শাসনামলে বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ এবং বাস্তবায়নের অভাবে বেশিরভাগ প্রস্তাব কার্যকর হয়নি।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি রোধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুদককে পুনর্গঠন করা হয়েছে, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা আনা হয়েছে এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০২৫ চালু হয়েছে। তার মতে, এসব পদক্ষেপে সরকারি কর্মচারীদের কাজে স্বচ্ছতা বাড়বে।
সব মিলিয়ে, স্বাধীনতার পর থেকে বহুবার সিভিল সার্ভিস সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুর্নীতি কমেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্নীতি রোধে কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছ নিয়োগ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হতে পারে বাস্তব সমাধান।