সর্বশেষ

সুইজারল্যান্ডের আড়ালে আজারবাইজান

ইউনূসের ব্যক্তিগত স্বার্থে বিতর্কিত সকারের থেকে জিটুজিতে এলএনজি কেনা হচ্ছে?

প্রকাশিত: ৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০
ইউনূসের ব্যক্তিগত স্বার্থে বিতর্কিত সকারের থেকে জিটুজিতে এলএনজি কেনা হচ্ছে?
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গত ৭ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্টের দুই মেয়ে ও বাংলাদেশে দেশটির অনাবাসিক রাষ্ট্রদূত এলচিন হুসেনলি

সুইজারল্যান্ডের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরকার জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট) পদ্ধতিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নিলেও, এর নেপথ্যে থাকা কোম্পানি ও প্রক্রিয়া ঘিরে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক সকার ট্রেডিং এসএ নামের যে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি আদতে আজারবাইজানের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কোম্পানি সকারের শতভাগ মালিকানাধীন একটি বাণিজ্যিক শাখা। অথচ সুইজারল্যান্ড নিজেই কোনো তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ নয়।

 

এই বাস্তবতায় জিটুজি চুক্তি আজারবাইজানের পরিবর্তে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে কেন—সে প্রশ্ন তুলেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। কারণ জিটুজি চুক্তির মূল দর্শন হলো দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরাসরি চুক্তি, কোনো বেসরকারি মধ্যস্থতাকারী ছাড়া। অথচ এখানে কার্যত একটি বিতর্কিত রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির ট্রেডিং আর্মসকে সামনে রেখে সেই নীতির ব্যত্যয় ঘটানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

গত মঙ্গলবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভায় স্বল্পমেয়াদে সকার ট্রেডিংয়ের কাছ থেকে এলএনজি কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারের দাবি, স্পট মার্কেটের তুলনায় এতে প্রতি কার্গোতে অন্তত ২০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। তবে সমালোচকরা বলছেন, শুধু দামের যুক্তি দেখিয়ে এমন একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ, যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে দুর্নীতি, ঘুস বাণিজ্য, অর্থ পাচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, সকার ট্রেডিংয়ের বিরুদ্ধে মাল্টায় একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে সন্দেহজনক অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল। ওই ঘটনায় মাল্টার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ও জ্বালানিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ঘুস গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। সেই কেলেঙ্কারির অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন সাংবাদিক ড্যাফনি কারুয়ানা গালিজিয়া, যিনি ২০১৭ সালে গাড়িবোমা হামলায় নিহত হন। মামলার মূল অভিযুক্ত ইয়র্গেন ফেনেক বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

 

এ ছাড়া বাংলাদেশেও সকারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সকার একিউএসের সঙ্গে বাপেক্সের একটি মামলা আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান। গ্যাস কূপ খনন প্রকল্পে চুক্তি বাতিলকে কেন্দ্র করে সকার প্রায় ৮৮৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করে, যার আংশিক রায় তাদের পক্ষে গেছে এবং বিষয়টি এখনো আপিলাধীন।

 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, “এ ধরনের বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যতে কোনো জটিলতা তৈরি হলে দেশের গ্যাস সংকট আরও গভীর হবে।”

 

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আজারবাইজানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে জিটুজি পদ্ধতিতে এলএনজি কেনার সিদ্ধান্তটি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে গত ডিসেম্বরে আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের দুই কন্যার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সৌজন্য সাক্ষাৎ আলোচনায় এসেছে। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের এই দৃশ্য স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন কল্পনা ও সন্দেহের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই চুক্তি থেকে ইউনূসের ব্যক্তিগত কোনো সুবিধা বা আর্থিক লাভ হয়েছে।

 

সব মিলিয়ে, এলএনজি আমদানির মতো সংবেদনশীল ও কৌশলগত খাতে স্বচ্ছতা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও অতীত অভিজ্ঞতার যথাযথ বিবেচনা ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব খবর

আরও পড়ুন

গণপরিষদ, সংবিধান সংস্কার ও ‘১৮০ কার্যদিবস’ নিয়ে বিভ্রান্তি

ভোটে জয় মানেই সরকার গঠন নয় গণপরিষদ, সংবিধান সংস্কার ও ‘১৮০ কার্যদিবস’ নিয়ে বিভ্রান্তি

বাজার অস্থিরতার মাঝেই ফের বাড়লো এলপিজি গ্যাসের দাম

১২ কেজি সিলিন্ডার ১,৩৫৬ টাকা বাজার অস্থিরতার মাঝেই ফের বাড়লো এলপিজি গ্যাসের দাম

শেষ মুহুর্তে গোঁজামিলের বিতর্কিত প্রকল্প নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার

চাপ বাড়বে নির্বাচিত সরকারের ওপর শেষ মুহুর্তে গোঁজামিলের বিতর্কিত প্রকল্প নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার

দুদক সংস্কারে অন্তত সাত উপদেষ্টার আপত্তি: ড. ইফতেখারুজ্জামান

দুদক সংস্কারে অন্তত সাত উপদেষ্টার আপত্তি: ড. ইফতেখারুজ্জামান

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি একের পর এক সিদ্ধান্ত

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও ব্যয় নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি একের পর এক সিদ্ধান্ত

নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর বিবৃতি নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনক

বাংলাদেশে নির্বাচন: পর্দার আড়ালে কি এখনও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী?

আল জাজিরার প্রতিবেদন বাংলাদেশে নির্বাচন: পর্দার আড়ালে কি এখনও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী?

কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ছে

রয়টার্সের প্রতিবেদন কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ছে