বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিশ্রুত মানবাধিকার সংস্কার বাস্তবায়নে কার্যত হিমশিম খাচ্ছে—এমন মূল্যায়ন করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটির ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার গুম, ভয়ভীতি ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি কিছুটা কমলেও নতুন করে রাজনৈতিক বিবেচনায় গ্রেপ্তার, নির্বিচার আটক এবং মব সহিংসতার বিস্তার দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আবারও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে গুম ও নিরাপত্তা বাহিনীর দমনমূলক কর্মকান্ডের ‘সাংগঠনিক আতঙ্ক’ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পরও অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে দমনে কঠোর পন্থা অবলম্বন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হাজারো মানুষকে ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করে আটক করা হয়েছে, যাদের অনেকেই বিচার ছাড়াই দীর্ঘদিন কারাগারে আছেন এবং নিয়মিতভাবে জামিন নাকচ হচ্ছে।
এইচআরডব্লিউ বলেছে, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় শত শত অজ্ঞাতনামা আসামি করার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে এক অভিযানে অন্তত ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো কঠোর আইন ব্যবহার করে ভিন্নমত দমনের অভিযোগও রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আরেক বড় দিক হিসেবে উঠে এসেছে মব সহিংসতা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের আগস্টের মধ্যে গণপিটুনিতে অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং রাজনৈতিক সংঘাতও বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর হিসাবে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কমপক্ষে ৪০ জন নিহত এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় ৮ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ রয়েছে। সাইবার সিকিউরিটি আইনের কিছু ধারা সংশোধন করা হলেও এখনো তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে লেখক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনাও অব্যাহত।
অন্তর্বর্তী সরকার অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে কমিশন গঠন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত বলেই মনে করছে এইচআরডব্লিউ। বিচার বিভাগ, পুলিশ ও নির্বাচন ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে থমকে আছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দমনমূলক অতীত থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ থাকলেও বর্তমান সরকারের নীতি ও প্রয়োগের দ্বৈততা সেই সম্ভাবনাকে দুর্বল করছে। নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক গ্রেপ্তার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও সংকুচিত হতে পারে।