জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, হত্যাকাণ্ড ও উপাসনালয়ে ভাঙচুরের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। পত্রিকাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মেরুকরণ, ইসলামপন্থি দলগুলোর পুনরুত্থান এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ডিসেম্বর মাসে ২৭ বছর বয়সী হিন্দু পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাস ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে সহকর্মীদের একাংশের রোষানলে পড়েন। অভিযোগের পর তার কর্মস্থলে উত্তেজিত জনতা হামলা চালায়। তাকে মারধর করে হত্যা করা হয়, পরে গাছে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন দেওয়া হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হলে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূস তদন্তের নির্দেশ দেন এবং পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় অন্তত এক ডজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
সহিংসতার চিত্র
ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্যমতে, প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে হিন্দুর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দুই হাজারের বেশি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
সংগঠনটির তথ্যমতে গত দেড় বছরে অন্তত ৬১ জন নিহত হয়েছেন, ২৮টি নারী নির্যাতনের ঘটনা (ধর্ষণ ও গণধর্ষণসহ) ও ৯৫টি মন্দির বা উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঘটেছে। সংখ্যালঘু নেতাদের অভিযোগ, প্রশাসন অনেক সময় ঘটনাগুলোকে গুরুত্বহীন বা ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ঢাকাভিত্তিক হিন্দু মানবাধিকারকর্মী রঞ্জন কর্মকার ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, “এখন আর কেউ নিরাপদ মনে করছে না। সবাই ভীত। অপরাধীরা শাস্তি না পাওয়ায় মনে হচ্ছে সহিংসতা চলতেই থাকবে।”
নির্বাচনের আগে বাড়তি ঝুঁকি
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বছর আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় এবং শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল। হিন্দুদের দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে দেখা হওয়ায় তাদের রাজনৈতিকভাবে টার্গেট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কিছু এলাকায় সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে ভোটার উপস্থিতি কমানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
ইসলামপন্থিদের পুনরুত্থান
ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন আবার সক্রিয় হয়েছে। তারা শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে থাকলেও জনসমর্থন বাড়াতে সংখ্যালঘুদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে—কিছু সমাবেশে হিন্দুদের অংশগ্রহণ ও প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ পত্রিকাটিকে বলেন, এসব পদক্ষেপ মূলত প্রতীকী এবং বাস্তব সুরক্ষা নিশ্চিত করে না। তার মতে, গ্রামীণ এলাকায় পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় তৈরি করা হচ্ছে, যা নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে।
ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনা
হিন্দুদের ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনাও বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব ঘটনাকে ‘উদ্বেগজনক ধারাবাহিক হামলা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বাংলাদেশ পাল্টা এটিকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। এই টানাপোড়েনের সূত্রধরে ভিসা পরিষেবা ও টি-২০ ক্রিকেট বিশ্বকাপেও এর প্রভাব পড়েছে।
শোকাহত পরিবারের বিচার দাবি
দীপু চন্দ্র দাস ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তার মৃত্যুতে স্ত্রী ও মা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। তার মা শেফালি রানী দাস বলেন,
“ওরা আমার ছেলেকে মারল, গাছে ঝুলাল, আগুন দিল। আমি বিচার চাই।”
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছে।