সর্বশেষ

প্রতিনিধিত্ব নাকি প্রতীকী অংশগ্রহণ?

দেড় দশকে সর্বনিম্ন মাত্র ৬৫ নারী প্রার্থী, এক-তৃতীয়াংশই পারিবারিক সূত্রে

প্রকাশিত: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০
দেড় দশকে সর্বনিম্ন মাত্র ৬৫ নারী প্রার্থী, এক-তৃতীয়াংশই পারিবারিক সূত্রে
স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচনী প্রচারণা, মুন্সীগঞ্জ, ২০২১।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো মুখে নারী ক্ষমতায়নের কথা বললেও বাস্তব চিত্র বলছে সম্পূর্ণ উল্টো গল্প। এবারের নির্বাচনে ৭৮ জন নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ সংখ্যার দিক থেকে একটি নতুন লজ্জার রেকর্ড যা বলে দিচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে লিঙ্গসমতা এখনো অনেক দূরের পথ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যৎসামান্য উপস্থিতির মধ্যেও আবার গুণগত প্রতিনিধিত্বের চেয়ে ‘প্রতীকী অংশগ্রহণ’ বেশি, যেখানে নারীদের বড় অংশই নিজস্ব রাজনৈতিক সংগ্রামের বদলে পারিবারিক উত্তরাধিকার বা প্রভাবশালী পুরুষ রাজনীতিকের সম্পর্কের সূত্রে প্রার্থী হয়েছেন। এতে করে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনো ‘প্রতীকী’, কাঠামোগত নয়।

 

মনোনয়ন যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহার শেষে ভোটের লড়াইয়ে টিকে থাকা ১ হাজার ৯৯১ প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ৬৫ জন। অর্থাৎ, মোটের ওপর সাড়ে তিন শতাংশেরও কম। দেড় দশকের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন হার। দেশে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন, যা পুরুষ ভোটারের (৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১) প্রায় সমান। মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জনের প্রায় অর্ধেকই নারী। অথচ প্রার্থিতায় তাদের উপস্থিতি নগণ্য। ভোটার সমতায়ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে এমন বৈষম্য গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন তোলে।

 

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৫১টি রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে অন্তত ৩০টি দল একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি। নারী ক্ষমতায়নের কথা নিয়মিত বললেও জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় দলও এবার কোনো নারীকে মনোনয়ন দেয়নি। ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, এলডিপিসহ আরও বহু দল একই পথে হাঁটছে। এটি কেবল সাংগঠনিক দুর্বলতা নয়; বরং গভীর পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন।

 

২০২৪ সালে নারী প্রার্থী ছিলেন ৯৪ জন (প্রায় ৫.১৫%), ২০১৮ সালে ৬৯ জন (৩.৮০%), ২০১৪ সালে প্রায় ৫.৫৫ শতাংশ। সে তুলনায় এবারের হার আরও বেশি হতাশাজনক। এমনকি আওয়ামী লীগ আমলের তথাকথিত বিতর্কিত বা একতরফা বলে সমালোচিত নির্বাচনগুলোর সময়েও নারীর অংশগ্রহণ বেশি ছিল।

 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অংশগ্রহণকারী নারীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাত্র ৬৭টি আসনে। অর্থাৎ দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে সরাসরি নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিত্বের সুযোগই নেই।

 

তদুপরি এই ক্ষুদ্র সংখ্যাটুকুও গুণগত প্রতিনিধিত্বের নিশ্চয়তা দেয় না। ৬৫ জনের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি প্রার্থী প্রভাবশালী পুরুষ রাজনীতিকের স্ত্রী, কন্যা বা পরিবারের সদস্য। নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, যাদের শক্তিশালী পারিবারিক বা দাম্পত্য রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক আছে, তারাই তুলনামূলকভাবে ভালো ফল করেন।

 

বিএনপির উদাহরণই তা স্পষ্ট করে। তাদের ১০ নারী প্রার্থীর প্রায় সবাই শীর্ষ নেতাদের পরিবারের সদস্য। ফরিদপুর-২ থেকে শামা ওবায়েদ (কেএম ওবায়দুর রহমানের কন্যা), ফরিদপুর-৩ থেকে নায়াব ইউসুফ (চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের কন্যা), নাটোর-১ থেকে ফারজানা শারমিন (ফজলুর রহমানের কন্যা), যশোর-২ থেকে সাবিরা সুলতানা মুন্নি (সাবেক এমপির স্ত্রী), সিলেট-২ থেকে তাহসিনা রুশদীর লুনা (ইলিয়াস আলীর স্ত্রী)—তালিকা দীর্ঘ। অন্যান্য দলেও একই প্রবণতা দেখা যায়।

 

তবে ব্যতিক্রমও আছে। বাসদ-মার্ক্সবাদী তাদের মোট প্রার্থীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নারী দিয়েছে (৯ জন)। গণসংহতি আন্দোলন দিয়েছে ৪ জন, জাতীয় পার্টি ৫ জন, গণঅধিকার পরিষদ ৩ জন, এবি পার্টি ৩ জন। কিন্তু বড় দলগুলোর অনীহা সামগ্রিক চিত্র বদলাতে পারেনি।

 

নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী সাম্প্রতিক এক আলোচনায় বলেন, “বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা এখনো গভীরভাবে পুরুষতান্ত্রিক। তৃণমূল থেকে সংগ্রাম করে উঠে আসা নারী নেতৃত্ব খুবই কম। অধিকাংশ নারী পারিবারিক প্রভাবের মাধ্যমেই রাজনীতিতে আসেন।”

 

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম বলেন, দলীয় পদে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আইন থাকলেও প্রার্থী মনোনয়নে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে দলগুলো কেবল ‘জয়ের সম্ভাবনা’ দেখে সিদ্ধান্ত নেয়। “তারা মনে করে নারীরা জিততে পারবে না, আর্থিক সক্ষমতাও কম—এই ধারণাই নারী মনোনয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে,” বলেন তিনি।

 

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রণীত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫–এ এবারের নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে তা বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশ করার লক্ষ্য। কিন্তু জুলাই সনদে সাক্ষর করে আসা একটি দলও সে নিয়মের ধার ধারেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি তাই আদতে কাগজেই সীমাবদ্ধ।

 

মহিলা পরিষদের সভানেত্রী ডা. ফাওজিয়া মোসলেম মনে করেন সংসদে নারী না থাকলে নারী অধিকারের কথা কেউ তুলবে না। সাবেক নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরিন পারভীন হক মনে করেন, দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব ও নারীবান্ধব নীতির ঘাটতিই এই সংকটের মূল কারণ। তিনি সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী আসনের প্রস্তাবের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।

 

স্বাধীনতার পর থেকে নারী প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস দেখলে আমরা দেখি ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালে কোনো নারী সাংসদ নির্বাচিত হননি। ১৯৮৬ সালে ৫ জন, ১৯৮৮ সালে ৪ জন নির্বাচিত হোন। ১৯৯১ সালে ৪ জন, ১৯৯৬ সালে ৫ জন, ২০০১ সালে ৬ জন, ২০০৮ সালে ১৯ জন, ২০১৪ সালে ১৮ জন, ২০১৮ সালে ২২ জন, ২০২৪ সালে ২০ জন। যদিও এই বৃদ্ধি কখনোই জনসংখ্যার অনুপাতে হয়নি। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আনুপাতিক হারে এবার পূর্বতন ক্রমানুপাতিক বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

নারীদের জন্য নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ, আর্থিক সহায়তা, দলীয় কোটার কার্যকর বাস্তবায়ন এবং তৃণমূল নেতৃত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ ছাড়া এই বৈষম্য কমবে না। তা না হলে সংখ্যার হিসাব যতই বদলাক, ক্ষমতার কেন্দ্র পুরুষদের হাতেই থেকে যাবে। এই বৈষম্য অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্র দুর্বল হবে। কারণ, দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে কার্যত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রেখে কোনো প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতি টেকসই হতে পারে না।

 

ফলে প্রশ্ন থেকেই গেল, এই নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা কি আদৌ নারী প্রতিনিধিত্ব, নাকি একই পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার ‘প্রতীকী সাজসজ্জা’?

সব খবর

আরও পড়ুন

১৯ থেকে ৭ এ নেমেছে সরাসরি নির্বাচিত নারী সাংসদের সংখ্যা

বিজয়ের ঢেউয়ে ভাটা নারী প্রতিনিধিত্বে ১৯ থেকে ৭ এ নেমেছে সরাসরি নির্বাচিত নারী সাংসদের সংখ্যা

নির্বাচনকে সামনে রেখে দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে ইসলামপন্থী দলের উত্থানে শঙ্কা

‘নারীর স্বাধীনতা হুমকির মুখে’ নির্বাচনকে সামনে রেখে দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে ইসলামপন্থী দলের উত্থানে শঙ্কা

নারী ভোটারই ‘টার্গেট’, কিন্তু প্রার্থী তালিকায় উপেক্ষিত নারী নেতৃত্ব

নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব সংকটে সমালোচনা নারী ভোটারই ‘টার্গেট’, কিন্তু প্রার্থী তালিকায় উপেক্ষিত নারী নেতৃত্ব

নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য জামায়াত আমীরের প্রার্থিতা বাতিলের দাবি

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের যৌথ বিবৃতি নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য জামায়াত আমীরের প্রার্থিতা বাতিলের দাবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝাড়ু হাতে প্রতিবাদ নারী শিক্ষার্থীদের

জামায়াত আমীরের ‘নারীবিদ্বেষী পোস্ট’ নিয়ে ক্ষোভ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝাড়ু হাতে প্রতিবাদ নারী শিক্ষার্থীদের

ভোটে নারী প্রার্থী মাত্র ৪ শতাংশ হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক

সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির বিবৃতি ভোটে নারী প্রার্থী মাত্র ৪ শতাংশ হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক

ঝিনাইদহে বিধবা হিন্দু নারীকে গণধর্ষণ করেছে দুই মুসলিম যুবক

গাছের সঙ্গে বেঁধে চুল কেটে নেওয়া হয় ঝিনাইদহে বিধবা হিন্দু নারীকে গণধর্ষণ করেছে দুই মুসলিম যুবক

ঢাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নারী নির্যাতন

ভিডিও ভাইরাল, পাঁচজন আটক ঢাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নারী নির্যাতন