সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি জনাকীর্ণ এলাকায় অবস্থিত দুই তলা বিশিষ্ট একটি সাধারণ ঘর এখন বহু বাংলাদেশি নারীর কাছে সাক্ষাৎ নরক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ০৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক ‘কালের কণ্ঠ’-এর প্রথম পাতায় প্রকাশিত এক লোমহর্ষক প্রতিবেদনে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়া বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। সাংবাদিক এম টি লামীম, সুজন মাহমুদ ও কামরুল হাসানের যৌথ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, রিয়াদের এই কথিত ‘ক্যাম্প’ বা অফিসগুলো আসলে একেকটি অন্ধকার কারাগার, যেখানে পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে জিম্মি করে রাখা হয়েছে শত শত নারীকে। সেখান থেকেই ইমোর মাধ্যমে এক তরুণীর শেষ আকুতি ছিল— ‘ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে মেরে ফেলবে, বাঁচান’।
অনুসন্ধানী এই প্রতিবেদনের সূত্রপাত হয় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি জাজিরা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে রিয়াদ থেকে কুয়েত হয়ে দেশে ফেরেন হবিগঞ্জের এক নির্যাতিতা তরুণী। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের হাতে একটি ছোট চিরকুট গুঁজে দেন। সেই চিরকুটে ছিল নওগাঁর এক ২২ বছর বয়সী তরুণীর মায়ের মোবাইল নম্বর এবং তার ব্যবহৃত ইমো নম্বর।
সেই চিরকুটের সূত্র ধরেই সংবাদকর্মীরা পৌঁছে যান নওগাঁর সদর উপজেলার মধ্যদুর্গাপুর গ্রামে। সেখানে দেখা যায় এক রিক্ত মায়ের হাহাকার। অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে স্থানীয় দালাল রাজ্জাকের প্রলোভনে পড়ে কোনো টাকা ছাড়াই মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তিনি। দালাল বলেছিল, মেয়ে শুধু পাসপোর্ট করলেই হবে, বাকি সব খরচ কোম্পানি বহন করবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার দুই দিনের মাথায় শুরু হয় বিভীষিকা।
নওগাঁর সেই তরুণী গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে ইমোতে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, রিয়াদের সেই ভবনের নিচতলায় রুহানা নামের এক ফিলিপিনো নারী থাকেন, যিনি পুরো বিষয়টি তদারকি করেন। ওপরতলায় তিনটি পৃথক কক্ষে অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন করে নারীকে অত্যন্ত গাদাগাদি অবস্থায় আটকে রাখা হয়েছে। কারো কাছেই কোনো যোগাযোগ মাধ্যম বা পরিচয়পত্র নেই। দিনের পর দিন তারা সেখানে কেবল আতঙ্ক আর ক্ষুধার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। খাবারের মান অত্যন্ত নিম্নমানের; সকালে ও রাতে কেবল এক কাপ চায়ের সঙ্গে একটি রুটি দেওয়া হয় এবং দুপুরে পাস্তা। ভাত জোটে তিন থেকে চার দিন পর পর। এই করুণ দশার মধ্যেও চলে শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা।
প্রতিবেদনটিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই তথাকথিত ক্যাম্পগুলো আসলে নারী কেনাবেচার একেকটি কেন্দ্র। সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কফিলরা সেখানে আসেন এবং পছন্দমতো গৃহকর্মী দরদাম করে নিয়ে যান। নওগাঁর সেই তরুণী জানান, তাকে প্রথমে যে বাসায় কাজে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে গৃহকর্তা তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দেয়। রাজি না হওয়ায় তাকে জখম করে এই ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়। সেখানে যারা অবাধ্য হয় বা অনৈতিক কাজের বিরোধিতা করে, তাদের ওপর নেমে আসে কঠোর নির্যাতন। ক্যাম্পের ভেতর বাংলাদেশি নারীদের পাশাপাশি অন্য দেশের নারীরাও জিম্মি রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কালের কণ্ঠের এই বিশেষ অনুসন্ধানে দালালদের চরম ছলচাতুরির বিষয়টিও উঠে এসেছে। হবিগঞ্জের যে তরুণী চিরকুটটি দিয়েছিলেন, তাকে দেশে আনার সময়ও দালালরা দফায় দফায় সময় পরিবর্তন করে সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। শেষ পর্যন্ত ভোর ৬টায় তিনি অবতরণ করলে বেরিয়ে আসে সৌদি আরবের সেই অন্ধকার জগতের কাহিনী। রিয়াদ শহরের মাঝখানে এমন বন্দিশালা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট এজেন্সি বা দালালরা আগে থেকেই সব জানত বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী নারী। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, শুধু আমরাই জানতাম না যে আমাদের কপালে এমন অন্ধকার কারাগার অপেক্ষা করছে।
এই প্রতিবেদনটি মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার চরম অভাবকে পুনরায় জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে জিটুজি চুক্তির আওতায় গিয়েও নারীরা কেন এমন ক্যাম্পবন্দি হচ্ছেন এবং কেন তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে সংবাদটি। নওগাঁর সেই তরুণীর সর্বশেষ বার্তাটি ছিল অত্যন্ত আতঙ্কজনক। তিনি জানিয়েছিলেন, তাকে আবারও কোথাও সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তার জীবন এখন চরম সংকটাপন্ন। এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি উঠেছে।