টানা কয়েক মাস ধরে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন দেশের প্রান্তিক পোলট্রি খামারিরা। খামারিদের দাবি, প্রতি ডিম উৎপাদনে যেখানে খরচ পড়ছে প্রায় সাড়ে ৯ টাকা, সেখানে তাদের বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ৬ টাকার মতো দামে। ফলে প্রতিটি ডিমে প্রায় তিন টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি চলতে থাকায় অনেক খামারি ঋণের চাপে পড়েছেন, কেউ খামার বন্ধ করে দিয়েছেন, আবার কেউ অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
সম্প্রতি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, একসময় কর্মচাঞ্চল্যে ভরা পোলট্রি খামারগুলো এখন অনেক জায়গায় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও খালি শেড পড়ে আছে, আবার কোথাও সীমিত পরিসরে খামার চালিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন খামারিরা।
ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী ইউনিয়নের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম চকদার একসময় কয়েক হাজার মুরগির বড় খামারের মালিক ছিলেন। খামারে একাধিক কর্মচারীও কাজ করতেন। কিন্তু টানা লোকসানের কারণে এখন তিনি সেই খামার বন্ধ করে একটি ভবনে দারোয়ানের কাজ করছেন। রবিউল ইসলাম বলেন, “জীবনের সব শ্রম দিয়ে খামার গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু লোকসানের বোঝা আর টানতে পারিনি। এখন অন্যের ভবনে পাহারাদারি করেই সংসার চালাতে হচ্ছে।”
টাঙ্গাইলকে অনেকেই ‘ডিমের রাজধানী’ বলে থাকেন। একসময় জেলার বিভিন্ন গ্রামে অসংখ্য পোলট্রি খামারকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল বড় কর্মসংস্থান। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। স্থানীয় খামারিরা জানান, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ছোট খামারগুলো টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভূঞাপুরের খামারি খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম জানান, গত কয়েক মাস ধরে ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে। তিনি বলেন, “একটি মুরগি ডিম দেওয়ার উপযোগী করতে প্রায় ১৮ সপ্তাহ সময় লাগে। এক হাজার মুরগি পালতে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু ডিম বিক্রি করে এখন মুরগির খাবারের খরচও উঠছে না।”
খামারিদের অভিযোগ, খামার থেকে কম দামে ডিম বিক্রি হলেও বাজারে সেই ডিমই অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে প্রতি হালি ডিম ২৪ থেকে ২৬ টাকায় নেওয়া হলেও খুচরা বাজারে তা ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়। মাঝখানে বড় অংশের লাভ যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে।
এদিকে মুরগির খাদ্য ও ওষুধের দামও বেড়েছে বলে অভিযোগ খামারিদের। তাদের দাবি, বড় কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে এসব পণ্যের দাম নির্ধারিত হয়, ফলে প্রান্তিক খামারিরা ন্যায্যমূল্যে এসব পণ্য কিনতে পারেন না।
দীর্ঘদিন ধরে পোলট্রি খাতের সঙ্গে যুক্ত খামারি আব্দুল মালেক বলেন, “প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে বিদ্যুৎ বিলও দিতে পারিনি। এভাবে চলতে থাকলে খামার বন্ধ করা ছাড়া আর উপায় থাকবে না।”
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ছোট খামারিদের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় তারা দ্রুত লোকসানের মুখে পড়েন। বড় বাণিজ্যিক খামার সহজে ঋণ ও সরকারি সুবিধা পায়, কিন্তু প্রান্তিক খামারিরা তা থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রান্তিক খামারিরাই দেশের পোলট্রি শিল্পকে এগিয়ে নিয়েছেন। তারা টিকে না থাকলে এই খাত কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিমের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ, স্বল্পসুদে ঋণ, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং খামারিদের জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা জরুরি।