আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক। ১৮ মাসের প্রতিশ্রুতি, জুলাই সনদ, সংস্কার আলোচনা ও নারীর ক্ষমতায়নের বুলি এমন চটকদার সব ছলনার পরও নির্বাচনী মাঠে নারীর উপস্থিতি নেমে এসেছে ইতিহাসের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে যেখানে সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও ৯৪ জন ভোটে ছিলেন নারী প্রার্থী। তাতে ১৯ জন জিতেছিলেন।। নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকার, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও নারী কমিশন—সবাই মিলেই এই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না।
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, মোট ১ হাজার ৯৮১ প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ৭৬ জন অর্থাৎ ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে নারীর হার আরও কম, প্রায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টির বেশি দল একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি। জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় দলসহ বহু ইসলামী ও মূলধারার দল নারীর প্রতিনিধিত্ব পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে। এবার নারী প্রার্থী রয়েছে ২০টি দলের। বাকি ৩১টি দল কোনো নারী প্রার্থীও দেয়নি।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী বিএনপিতে নারী প্রার্থী রয়েছেন ১০ জন। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলে-মার্কসবাদী ১০ জন, জাতীয় পার্টিতে ছয়জন এবং এনসিপিতে রয়েছেন দুইজন। এর বাইরে গণফোরামে দুইজন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ একজন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলে-বাসদ চারজন, গণসংহতি আন্দোলন তিনজন, গণঅধিকার পরিষদে-জিওপি তিনজন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ছয়জন, নাগরিক ঐক্যে একজন, বাংলাদেশের রিপাবলিকান পার্টিতে একজন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিতে দুইজন।
অথচ জুলাই ২০২৫ সালের জাতীয় ঐকমত্য অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, প্রতিটি দলকে অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে তা ৩৩ শতাংশে উন্নীত করা হবে। কিন্তু এই বিধান আজও কার্যকর হয়নি। আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই, নজরদারি নেই, শাস্তি নেই, ফলে এটি কাগুজে অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ। কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্য করা, ন্যূনতম নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং মনোনয়ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়া। বাস্তবে ইসি নির্বিকারভাবে দলগুলোর তালিকা অনুমোদন করেছে, এমনকি যেখানে কোনো দল ৫ শতাংশ তো দূরের কথা, একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি। এটি স্পষ্টতই কমিশনের দায়িত্বহীনতা।
রাজনৈতিক দলগুলোর দায় আরও গুরুতর। বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতসহ বড় দলগুলো ক্ষমতা-কেন্দ্রিক জোট রাজনীতির নামে নারীদের মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত করেছে। অনেক দল প্রকাশ্যে নারী ক্ষমতায়নের কথা বললেও বাস্তবে নারীদের “ঝুঁকিপূর্ণ প্রার্থী”, “জয়ের সম্ভাবনা কম” এই অজুহাতে সরিয়ে দিয়েছে। টাকা, পেশিশক্তি ও ধর্মীয় প্রভাবকে প্রাধান্য দিয়ে দলগুলো নারীর সাংবিধানিক অধিকারকে বিসর্জন দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ভূমিকাও হতাশাজনক। তারা নির্বাচনী সংস্কার ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিলেও নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। জাতীয় সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তারা ব্যর্থ হয়েছে।
নারী কমিশন ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতাও চোখে পড়ার মতো। যখন ৫০ শতাংশ ভোটার নারী, তখন সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব ৪ শতাংশের নিচে নামা একটি গণতান্ত্রিক বিপর্যয়। নারী কমিশনের উচিত ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া, কিন্তু তারা কার্যত দর্শকের ভূমিকায় থেকেছে।
পরিসংখ্যান আরও নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে। ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনে নারীরা সামনের সারিতে ছিলেন। অথচ সেই নারীরাই আজ সংসদে প্রবেশের দরজায় আটকে পড়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ৩৭ জন নারী মনোনয়ন দিলেও চূড়ান্তভাবে প্রার্থিতা টিকেছে মাত্র ছয়জনের।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও দেশীয় সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে, এই প্রবণতা সংসদকে আরও পুরুষতান্ত্রিক ও একপেশে করে তুলবে। আইন প্রণয়ন, বাজেট, সামাজিক নীতি—সব ক্ষেত্রেই নারীর কণ্ঠ আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যে দেশে ভোটারের অর্ধেকের বেশি নারী, সেখানে তাদের বাদ দিয়ে কি সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ সম্ভব? এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনো সংস্কারই টেকে না।
এই ব্যর্থতা কেবল সংখ্যার নয়, এটি গণতন্ত্রের ব্যর্থতা। নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকার, ঐকমত্য কমিশন ও নারী কমিশন—সবাই মিলে নারীর সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। এই নির্বাচন ইতিহাসে থেকে যাবে নারীর রাজনৈতিক বঞ্চনার এক করুণ উদাহরণ হিসেবে।
নির্বাচনে নারী প্রার্থীর চিত্র