জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর এবং জামায়াতে ইসলামিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের এক কর্মকর্তার ফাঁস হওয়া অডিও কথোপকথনের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে জামায়াতকে ‘নিয়ন্ত্রণের মধ্যে’ রেখে কাজে লাগানোর কৌশল বিবেচনা করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ওই কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ ‘ইসলামিক দিকে ধাবিত হচ্ছে’ এবং আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামি তাদের ইতিহাসের সেরা ফল পেতে পারে। তিনি প্রকাশ্যে বলেন, “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক।” এমনকি সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন, জামায়াতের প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনের নেতাদের টিভি অনুষ্ঠানে আনতে সহায়তা করার জন্য।
ফাঁস হওয়া অডিওতে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে শেখ হাসিনার দণ্ডাদেশ নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করতে শোনা যায় ওই কর্মকর্তাকে, যদিও তিনি একই সঙ্গে স্বীকার করেন, বিচারপ্রক্রিয়াটি স্বাধীন ও ন্যায়সঙ্গত ছিল না। নির্বাচনে জামায়াতের পরিবর্তে বিএনপি জিতলে দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া বিবৃতিতে ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস দাবি করেছে, এটি ছিল নিয়মিত অফ-দ্য-রেকর্ড আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো দলকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে না। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই অডিও ও প্রতিবেদন যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার দাবি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা আশ্বস্ত যে প্রয়োজনে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে জামায়াতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। ফাঁস হওয়া কথোপকথনে হুমকির সুরে বলা হয়, শরিয়াহ আইন বা নারীদের কর্মসংস্থানে বিধিনিষেধ আরোপ করলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক খাতে শুল্ক আরোপ করতে পারে, যা অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেবে।
এই অডিও ফাঁসের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ইতোমধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশে যেসব রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন হস্তক্ষেপের অভিযোগ করে আসছে, তারা এই অডিওকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করবে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচনপূর্ব পরিবেশ আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। জামায়াত, বিএনপি ও অন্যান্য দল যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে পরস্পরকে অভিযুক্ত করতে পারে, যা নির্বাচনকে আরও বিতর্কিত করে তুলবে।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র–ভারত সম্পর্কেও নতুন টানাপোড়েনের আশঙ্কা রয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। যুক্তরাষ্ট্রের এই যোগাযোগ দিল্লির উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
চতুর্থত, অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে পারে। নির্বাচনের নিরপেক্ষতা, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ—সব মিলিয়ে সরকারকে আরও কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই অডিও ফাঁস যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল বদলাবে কি না। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্যে বিতর্ক বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত স্বার্থের পথেই এগোবে, তবে ভবিষ্যতে আরও সতর্ক ও পর্দার আড়ালে কাজ করবে।
ফাঁস হওয়া এই অডিও শুধু একটি কূটনৈতিক বিতর্ক নয়; এটি বাংলাদেশের নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গভীর বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। সামনে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, এই ইস্যুর রাজনৈতিক অভিঘাত তত বাড়বে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।