নির্বাচন এলেই দেশের ব্যবসায়ী সমাজ যে অদৃশ্য অথচ প্রবল আর্থিক চাপের মুখে পড়ে, তা বহুদিনের ওপেন সিক্রেট। তবে রাজনৈতিক অর্থায়নের এই অস্বচ্ছ ও অনৈতিক চর্চা এবার নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে শিল্প খাতের শীর্ষ এক নেতার বক্তব্যে। এমপি প্রার্থীদের পক্ষ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলে টকশোতে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।
একটি টেলিভিশন টকশোতে তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় এমপি প্রার্থীদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীদের ওপর যে চাঁদার চাপ তৈরি হয়, তা এখন আর স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই। তার ভাষায়, “ব্যবসা করতে গিয়ে নানামুখী বাস্তবতা মেনে নিতে হয়, কিন্তু কোটি টাকার চাহিদা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” তিনি জানান, সম্প্রতি এক এমপি প্রার্থী ফোন করে দুই কোটি টাকা দাবি করেন, যেন তার প্রতিষ্ঠানে ওই প্রার্থীর মালিকানা রয়েছে— এমন ভঙ্গিতে।
শওকত আজিজ রাসেলের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বহু ব্যবসায়ী একই ধরনের চাপের মুখে পড়ছেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান, যেন এ ধরনের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং ব্যবসায়ীরা নির্ভয়ে অভিযোগ করতে পারেন।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে দলীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কারা এ ধরনের কাজে জড়িত, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যবসায়ী নেতারাও বাস্তবতার কঠিন চিত্র তুলে ধরছেন। নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এমনিতেই দেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় অত্যন্ত বেশি। জ্বালানি সংকট, করভার, লজিস্টিক সমস্যা ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতায় শিল্প খাত চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় নির্বাচনি চাঁদার মতো অবৈধ ব্যয় বহন করা অধিকাংশ ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব নয়।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নীতিগত সহায়তা ও জ্বালানি নিরাপত্তাই এখন বেশি জরুরি। নতুন করে অবৈধ ব্যয় শিল্প খাতকে আরও সংকটে ফেলবে।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দাবি করেছে, চাঁদাবাজি ইতোমধ্যেই সহিংস রূপ নিয়েছে। দলটির নেতা আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, চাঁদা না দেওয়ায় হামলা ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য ভয়াবহ হুমকি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনি চাঁদা নতুন নয়, তবে জুলাই আন্দোলনের পরও এ অনৈতিক চর্চা চলমান থাকা গভীর উদ্বেগের বিষয়। স্বেচ্ছা ও জোরপূর্বক— উভয় ধরনের অর্থায়নই গণতন্ত্র ও সুশাসনের পরিপন্থী।
রাজনৈতিক অর্থায়নের এই অদৃশ্য খরচ বন্ধ না হলে নির্বাচন যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হবে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্যও পড়বে আরও বড় ঝুঁকিতে।