ভারতে নির্বাসিত জীবনে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য রাজনৈতিক ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ইউনূসকে ‘খুনি ফ্যাসিস্ট’, ‘মহাজন’, ‘অর্থপাচারকারী’ ও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেছেন, ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভয়, নৈরাজ্য ও গণতন্ত্রের নির্বাসনের যুগে প্রবেশ করেছে।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে ‘সেভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার রেকর্ড করা অডিও বার্তা প্রচার করা হয়। তিনি সরাসরি উপস্থিত ছিলেন না। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক একাধিক মন্ত্রী, দলীয় নেতা ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা উপস্থিত ছিলেন।
ভাষণের শুরুতেই শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশ আজ এক গভীর খাঁদের কিনারে দাঁড়িয়ে।” তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে “এক বিশাল কারাগার, এক মৃত্যুকূপ, এক মৃত্যুপুরী” হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাকে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে এবং সেই দিন থেকেই দেশ ভয়াবহ সন্ত্রাসের যুগে প্রবেশ করেছে, গণতন্ত্র এখন নির্বাসনে।
তিনি দাবি করেন, মানবাধিকার ধুলায় পদদলিত, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ধ্বংস, নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্বিঘ্নে চলতে দেওয়া হচ্ছে। রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত গণপিটুনি, লুটপাট ও চাঁদাবাজি ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “জীবন ও সম্পত্তির কোনো নিরাপত্তা নেই, আইনশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।”
শেখ হাসিনার অভিযোগ, ইউনূস বিদেশি স্বার্থের কাছে দেশের ভূমি ও সম্পদ বিক্রি করে বাংলাদেশকে বহুজাতিক সংঘাতের অগ্নিকুণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তার ভাষায়, “দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে খুনি ফ্যাসিস্ট ইউনূস আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
ভাষণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এবং বলেন, “শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।” একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে দেশের গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের একমাত্র বৈধ ধারক হিসেবে তুলে ধরেন।
শেখ হাসিনা পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে—ইউনূস সরকারের অপসারণ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি, সহিংসতা ও নৈরাজ্যের অবসান, নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার অবসান এবং গত এক বছরের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের অধীনে নিরপেক্ষ তদন্ত।
একই দিনে তিনি আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দেওয়ার দাবি জানান। শেখ হাসিনা বলেন, “যদি সত্যিই গণতন্ত্রে বিশ্বাস থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দিন। জনগণই ঠিক করুক, কাকে তারা চায়।”
উল্লেখ্য, বর্তমানে তিনি ভারতের অজ্ঞাত স্থানে অবস্থান করছেন। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, দিল্লি থেকে দেওয়া এই ভাষণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে গভীর মেরুকরণ ও উত্তাপ সৃষ্টি করবে।