আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ভোটের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের কথা বললেও অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। নিবন্ধিত ৬০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ১৫টি দল দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে ও নিবন্ধন স্থগিত করে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও তাদের শরিকদের অনুপস্থিতি নির্বাচনকে একপক্ষীয় করে তুলছে—এমন আশঙ্কা করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য থাকে, যার মধ্যে অন্যতম হলো: ১. নির্বাচনী ফলাফলের অনিশ্চয়তা; ২. ভোটারদের সামনে বিভিন্ন দল, মত ও কর্মসূচিসম্পন্ন বিকল্প প্রার্থী থাকা; ৩. সকল প্রার্থীদের জন্য সমসুযোগ; ৪. ভোটারদের প্রভাবমুক্ত হয়ে বেছে নেওয়ার সুযোগ; এবং ৫. ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার রদবদলের সম্ভাবনা; ৬. সর্বজনীনতা; ৭. নির্বাচনী আইনের যথাযথ অনুসরণ। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সকল বৃহত্তর রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে না বিধায় কোন দল সরকার গঠন করবে তা আগেই একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে নির্বাচনে অনেক দল অংশ না নেওয়ায় সর্বজনীনতার শর্তটিও পূরণ হয়নি। তৃতীয়ত, নির্বাচনী আইনেরও যথাযথ অনুসরণ হচ্ছে না। নির্বাচনে ব্যাপকভাবে আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা ও সহিংসতা দৃশ্যমান হয়েছে। ঋণখেলাপি ও মামলা থাকা প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও আইন প্রয়োগে দ্বিচারিতা দেখা গেছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরও কম দলকে সক্রিয়ভাবে ভোটের মাঠে পাওয়া যাচ্ছে। অধিকাংশ দল থেকেই কোনো কোনো নেতা প্রার্থী হলেও তা একক ভাবে। দলীয় কোনো কার্যক্রম নেই তাদের ব্যাপারে। তদুপরি অংশ নেওয়া দলগুলোর বড় একটি অংশই অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক আসনে প্রার্থী দিতে পেরেছে। তথ্য অনুযায়ী, ২৯টি দল মাত্র ১ থেকে ২০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি দল ১০টি আসনেও প্রার্থী দিতে পারেনি এবং ১২টি দল পাঁচটির কম আসনে সীমাবদ্ধ রয়েছে। বিপরীতে, ১০০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিতে পেরেছে মাত্র পাঁচটি দল যার মধ্যে শতাধিক প্রার্থীতা টিকেছে আবার মাত্র ৪টি দলের।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—এ ধরনের অংশগ্রহণ কি সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করে?
সবচেয়ে বড় দল অনুপস্থিত, ভোটের বড় অংশ বাইরে
চলমান নির্বাচনে সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি আওয়ামী লীগের। দলটির কার্যক্রম অন্তর্বর্তী সরকার স্থগিত করার পর নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধনও স্থগিত করেছে। এর ফলে আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে নেই। দলটি ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সব সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দল হিসেবে পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের ভোটের হার প্রায় ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা দেশের মোট ভোটের প্রায় অর্ধেকের সমান।
আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোও এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, গণতন্ত্রী পার্টি ও জাতীয় পার্টি-জেপি। এছাড়া তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, ন্যাপ ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলসহ মোট প্রায় ২০টি রাজনৈতিক দল দলীয়ভাবে ভোটের বাইরে রয়েছে। পাহাড়ি আঞ্চলিক দলগুলোও নির্বাচন থেকে দূরে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দলগুলোর সম্মিলিত ভোটভাগ অতীতে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। ফলে ভোটের বড় একটি অংশ কার্যত এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধিত্বহীন থেকে যাচ্ছে।
অংশগ্রহণ থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা?
ইসি তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে বিএনপি থেকে ২৮৮টি আসনে, জামায়াতে ইসলামী থেকে ২২৪টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে ২৫৩টি এবং জাতীয় পার্টি থেকে ১৯২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছে। গণঅধিকার পরিষদ ১০০টির বেশি আসনে প্রার্থী দিলেও আসন সমঝোতার কারণে সেই সংখ্যা কমেছে।
তবে এসব দল ছাড়া অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই কার্যত প্রতীকী অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ। নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলি বলেন, “নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অন্তত ৩০টির ১০ শতাংশ আসনে প্রার্থী দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এতে বোঝা যায়, বড় কয়েকটি দলের বাইরে কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করলেও অনেক দল নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। মাঠপর্যায়ের শক্তি ছাড়া শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক দল গঠনের প্রবণতা ভোটারদের আস্থার সংকট তৈরি করে।
নির্বাচন বিশ্লেষক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, অনেক দল রাজনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব হিসেবে না দেখে সুবিধাভিত্তিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ রাখে। “কিছু দল ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। এতে রাজনীতির প্রতি জনগণের বিশ্বাস দুর্বল হয়,” বলেন তিনি।
অতীত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। অংশগ্রহণকারী দল যতই থাকুক, সরকার গঠন ও ভোটের মূল লড়াই এই দুই দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
২০১৪ ও ২০২৪ সালে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর বর্জনের কারণে নির্বাচন নিয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এবার পরিস্থিতি উল্টো—আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে তাদের। ফলে আবারও অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বর্তমানে ২৯৮ আসনে মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৩২ জনের দলীয় সম্পৃক্ততা আছে এবং ২৪৯ জন স্বতন্ত্র। তবে অনেক দলীয় ও অধিকাংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব না করায় অংশগ্রহণের সংখ্যা বাড়লেও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিশ্চিত হচ্ছে না—এমন মত বিশ্লেষকদের।
প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলের সংখ্যা বাড়লেও বড় ভোটভাগধারী দলগুলোর অনুপস্থিতি, অধিকাংশ দলের প্রার্থী সংকট এবং সীমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্বাচনকে কতটা অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করছে—সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন শুধু ভোট গ্রহণ নয়; বরং প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণ, বিকল্প রাজনৈতিক ধারার উপস্থিতি এবং ভোটারদের আস্থাই এর মূল মানদণ্ড।