দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এপ্রিল মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম একলাফে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের মাসে ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। নতুন এই মূল্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই কার্যকর হয়েছে।
একই সঙ্গে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ৬১ টাকা ৮৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতেও।
তবে বাস্তব বাজার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সরকারি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা থাকাকালীন সময়েও ভোক্তাদের অনেক ক্ষেত্রে ১৮০০ থেকে ২২০০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। এখন নতুন করে সরকারি দাম বাড়ানোর ফলে বাজারে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২৫০০ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভোক্তারা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে এলপিজি বিক্রিতে বড় ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। উত্তরার এক বাসিন্দা জানান, কয়েকটি দোকান ঘুরেও সরকারি দামে গ্যাস পাওয়া যায়নি; শেষ পর্যন্ত বেশি দামে কিনতে বাধ্য হয়েছেন। একই অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন লালবাগ ও টঙ্গীর বাসিন্দারাও।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে দেশে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি সরবরাহ হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ সরবরাহে ঘাটতির কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। তারপরও বাজারে কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ উঠেছে। ভোক্তাদের দাবি, একটি অসাধু সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়িয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে।
খুচরা বিক্রেতারা অবশ্য বলছেন, তারাও বেশি দামে গ্যাস কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, ডিলার পর্যায়েই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে এলপিজি ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, কোম্পানিগুলোই সরবরাহমূল্য বাড়িয়েছে, ফলে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং নজরদারির অভাবই এই অস্থিরতার মূল কারণ। কনজিউমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলমের মতে, কার্যকর প্রতিযোগিতা না থাকায় একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তার মতে, বিইআরসি, ভোক্তা অধিদপ্তর ও প্রতিযোগিতা কমিশনের সমন্বিত উদ্যোগ না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণ কার্যত ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। শহুরে জীবনে বিকল্প জ্বালানির সুযোগ সীমিত হওয়ায় তাদের জন্য এলপিজি ব্যবহার প্রায় বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে বাসাভাড়া, খাদ্যপণ্য ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে তাদের আর্থিক চাপ বহুগুণে বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এলপিজির এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে। রান্নার খরচ বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশেষজ্ঞরা ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে কঠোর নজরদারি, মূল্যতালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন।
সার্বিকভাবে বলা যায়, এলপিজি বাজারের এই অস্থিরতা এখন আর শুধু জ্বালানি সংকট নয়; এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলা একটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।