বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা বার ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে প্রার্থিতায় বাধা, মনোনয়ন বাতিল এবং আইনজীবীদের হয়রানির অভিযোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের শীর্ষ আইনি সংগঠন দ্য ল সোসাইটি অব ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস। সংস্থাটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-কে পাঠানো এক চিঠিতে বার নির্বাচনে ‘নজিরবিহীন হস্তক্ষেপের’ অভিযোগ তুলে ধরে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের দুই লাখের বেশি সলিসিটরের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট মার্ক ইভান্স স্বাক্ষরিত চিঠিটি গত বুধবার পাঠানো হয়। বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন ল সোসাইটির জুনিয়র প্রেস অফিসার আন্দ্রেয়া সোয়াইটজার। লিখিত বার্তায় তিনি জানান, চিঠিটি আনুষ্ঠানিকভাবেই ল সোসাইটির পক্ষ থেকে ইস্যু করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের বার নির্বাচনগুলোতে গুরুতর অনিয়ম, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং আইনজীবীদের স্বাধীনতায় হুমকির ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা, মনোনয়নপত্র জমা দিতে না দেওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক হেনস্তার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
ল সোসাইটির অভিযোগ, কিছু প্রার্থীর মনোনয়ন ‘ফ্যাসিস্টদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশের হস্তক্ষেপে কয়েকজন প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রত্যাহারে চাপ দেওয়া হয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। সংস্থাটি এসব ঘটনাকে আইনি পেশার স্বাধীনতা ও স্বশাসনের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
চিঠিতে জাতিসংঘের ‘বেসিক প্রিন্সিপালস অন দ্য রোল অফ লয়ার্স’-এর ১৬, ১৭, ১৮ এবং ২৩ নম্বর নীতির কথা উল্লেখ করে বলা হয়, আইনজীবীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তাদের হয়রানি করা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থি। বিশেষ করে প্রার্থিতা বাতিল, নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাকে নীতি ১৬-এর লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া পুলিশের কথিত সম্পৃক্ততা আইনজীবীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছে সংস্থাটি। চিঠিতে বলা হয়, আইনজীবীদের ‘সহযোগী’ বা ‘দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত করা তাদের পেশাগত পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের শামিল, যা আন্তর্জাতিক নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
চিঠির শেষাংশে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো- বৈষম্যহীনভাবে সব আইনজীবীর নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নির্বাচনি অনিয়ম ও সহিংসতার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং আইনজীবীরা যেন ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন তা নিশ্চিত করা।
চিঠির অনুলিপি যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার, ঢাকায় ব্রিটিশ হাই কমিশনার, জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এবং বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
এর আগে একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে চিঠি পাঠায় ইউরোপভিত্তিক শীর্ষ আইনজীবী সংগঠন কাউন্সিল অব বারস অ্যান্ড ল সোসাইটিজ অব ইউরোপ (সিসিবিই)। তাদের চিঠিতেও বাংলাদেশে বার নির্বাচনে অগণতান্ত্রিক পরিবেশ, প্রার্থিতা বাতিল এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
ফ্রান্সভিত্তিক সংগঠন জাস্টিস মেকার্স বাংলাদেশের (জেএমবিএফ) তথ্যের বরাত দিয়ে সিসিবিই সভাপতি রোমান জাভর্শেক ওই চিঠিতে বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত একাধিক জেলা বার ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে চরম অগণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করেছে।
সিসিবিই-এর চিঠিতেও অভিযোগ করা হয়, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত আইনজীবী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি, মনোনয়ন জমাদানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেককে পূর্ববর্তী সরকারের বা ‘ফ্যাসিস্টদের সহযোগী’ আখ্যা দিয়ে প্রার্থিতা বাতিল এবং পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপে প্রার্থিতা প্রত্যাহারে চাপ প্রয়োগের দাবি করা হয়।
এদিকে বুধবার ও বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার) নির্বাচনে ১১ হাজার ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৪ হাজার ৪৮ জন। ভোটের হার ছিল ৩৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। নির্বাচনে প্রায় ৪০ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয় বলে জানা গেছে।