জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে হঠাৎ করেই হাজার কোটি টাকার বাস কেনার প্রক্রিয়ায় গতি এনেছে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। বিদায়ের প্রাক্কালে এমন বড় অঙ্কের প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগকে ঘিরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও উদ্দেশ্য নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। সমালোচকদের অভিযোগ, শেষ মুহূর্তে পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দিতেই তড়িঘড়ি করে দরপত্র প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) প্রায় ১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৪০টি সিএনজি সিঙ্গেল ডেকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস কেনার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ গত ডিসেম্বরে শেষ হলেও এখন নির্বাচনের ঠিক আগে দরপত্র জমা ও উন্মুক্ত করার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আটটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে।
দরপত্রে অংশগ্রহণের শর্ত নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ১০ লাখ মার্কিন ডলার জামানত, ২০ বছরের সরবরাহ অভিজ্ঞতা, বিদেশে শত শত বাস রপ্তানির প্রমাণ এবং বছরে অন্তত ২৫০টি বাস উৎপাদন সক্ষমতার মতো কঠোর শর্ত দেওয়া হয়েছে। পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব শর্ত কার্যত কয়েকটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই অনুকূল, যা প্রতিযোগিতা সীমিত করে দিতে পারে।
এছাড়া মূল প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবে বাসগুলো কোরিয়ায় নির্মিত হতে হবে বলা থাকলেও পরে শর্ত শিথিল করা হয়েছে। এখন কেবল কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান হলেই চলবে। এতে দরপত্রের নীতিগত সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিআরটিসির প্রকল্প পরিচালক কাজী আইয়ুব আলী তড়িঘড়ির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, সব কাজ নিয়ম মেনেই হচ্ছে। চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লাও দাবি করেছেন, এটি নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। ২০২৩ সালে একনেক অনুমোদন পাওয়ার পর দীর্ঘ আড়াই বছর প্রকল্পটি স্থবির ছিল। প্রশাসনিক জট, ঋণদাতা সংস্থার আপত্তি ও দরপত্র সংশোধনের অজুহাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি। অথচ নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই হঠাৎ দ্রুততা যা সন্দেহ আরও ঘনীভূত করেছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক শামছুল হক প্রশ্ন তুলেছেন, “বিআরটিসির বাস রাখার জায়গাই নেই, নতুন বাস কিনে কোথায় রাখা হবে?” তাঁর মতে, অবকাঠামো ও পরিচালন সক্ষমতা নিশ্চিত না করে বড় প্রকল্প নেওয়া শুধু অপচয় বাড়াবে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন উচ্চমূল্যের প্রকল্প বাস্তবায়ন ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর আর্থিক ও নীতিগত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই দরপত্র প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ও স্বাধীন নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি, নচেৎ এটি জনস্বার্থের বদলে রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।