বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রথমে ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও পরে সরকার সময়সীমা আরও কমিয়ে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে।
শুরুতে বাংলাদেশ দোকান ব্যবসায়ী মালিক সমিতি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সহযোগিতার লক্ষ্যে সারাদেশে দোকান, বাণিজ্য বিতান ও শপিংমল রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে বিদ্যুৎ সাশ্রয় জরুরি হয়ে পড়েছে এবং ব্যবসায়ীরা স্বেচ্ছায় এ উদ্যোগ নিয়েছেন।
সংগঠনের সভাপতি নাজমুল হাসান মাহমুদ জানান, স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান টিপু বলেন, করোনাকালের অভিজ্ঞতা থেকে ব্যবসায়ীরা এই সময়সীমায় অভ্যস্ত থাকায় এতে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে এ সিদ্ধান্তে ঠিক কতটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো হিসাব তখনও তাদের কাছে ছিল না।

তবে পরবর্তী সময়ে সরকার আরও কঠোর অবস্থান নেয়। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে দোকানপাট ও বিপণিবিতান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি জানান, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে এই সময়সীমা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করা হবে এবং এ বিষয়ে নজরদারিও জোরদার করা হবে।
সরকারি এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সন্ধ্যা ৬টার পর খোলা রাখা যাবে না। তবে হোটেল, ফার্মেসি, জরুরি সেবার দোকান এবং কাঁচাবাজারকে এই নিয়মের বাইরে রাখা হয়েছে, যাতে নাগরিকদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা ব্যাহত না হয়।
একই সঙ্গে সরকারি অফিসের সময়সূচিও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সরকারি অফিস চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত, যা আগের সময়সূচির তুলনায় এক ঘণ্টা কম। ব্যাংক লেনদেনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত।
সরকারি ব্যয় কমাতেও নেওয়া হয়েছে একাধিক পদক্ষেপ। আগামী তিন মাস নতুন কোনো যানবাহন, জলযান, আকাশযান বা কম্পিউটার সরঞ্জাম কেনা যাবে না। অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে এবং সরকারি অর্থায়নে বিদেশ প্রশিক্ষণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সভা-সেমিনারের ব্যয়ও অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও ধাপে ধাপে নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সব প্রতিষ্ঠানের জন্য এক ধরনের সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে শিক্ষাকার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে বিয়ে বা উৎসবে আলোকসজ্জার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ছে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। চলমান আন্তর্জাতিক অস্থিরতায় সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও কাজাখস্তান থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের পরিবহনে ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বাস ব্যবহারে উৎসাহ দিতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি স্কুলগুলোকে শুল্কমুক্তভাবে নতুন ইলেকট্রিক বাস আমদানির সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সরকার সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমিয়ে আনতে চায়, তবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না। একই সঙ্গে অবৈধ মজুদ ও কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
এই নতুন সময়সূচি কতদিন কার্যকর থাকবে, তা এখনো নির্দিষ্ট করা হয়নি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সরকার।