কড়াইল বস্তির ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন অন্তত ১০ হাজার বস্তিবাসী। মশারি ও কম্বলই তাদের একমাত্র সম্বল। খাবার পানি, গোসল, বাথরুম—কোনো মৌলিক সুবিধাই নিশ্চিত হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত অধিকাংশ পরিবারই এখনো সরকারি ত্রাণ বা পুনর্বাসন সহায়তা পাননি।
৫০ বছর বয়সী জাহানারা বেগম কড়াইলের ‘ক’ ব্লকে থাকতেন। আগুনে তার দেড় রুমের ঘরটি পুড়ে গেছে। নয়জন সদস্য নিয়ে এখন তেরপল টাঙানো অস্থায়ী ছাউনিতে কাটছে দিন-রাত। তিনি বলেন, “পানি নেই, স্যানিটেশন নেই। রাতে শিশুরা কাঁদে। আগুনের পর বেসরকারিভাবে প্রথম দিকে কিছু খাবার, মশারি পেয়েছিলাম। এখন আর কেউ আসে না।”
এ অভিজ্ঞতা শুধু জাহানারার নয় বরং সহস্রাধিক পরিবার একই দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে। বস্তিবাসীরা জানান, অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথম কয়েকদিন এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থেকে কিছু ত্রাণ মিললেও এখন সবাই যেন ভুলে গেছে কড়াইলের মানুষদের। সরকারি কোনো সংস্থা এখনো কার্যকর উদ্যোগ নেননি।
গত ২৫ নভেম্বর রাজধানীর সবচেয়ে বড় বস্তি কড়াইলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট পাঁচ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অন্তত দেড় হাজার ঘর পুড়ে গেলেও স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। মোট ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে, যাদের বড় অংশ নারী ও শিশু।

দিনমজুর সোহাগের পরিবারও পুড়েছে আগুনে। তিনি বলেন, “এই নিয়ে তিনবার আমাদের ঘর পুড়ল। আগে আগুন লাগলে সবাই ছুটে আসত, সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ মিলত। এবার তেমন কোনো তৎপরতা দেখছি না।” তার স্ত্রী ফাতেমা যোগ করেন, “১০ দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে। বাথরুম-গোসলের জন্য দূরে যেতে হয়, পানি আনা কঠিন। আমরা মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত।”
সরজমিনে দেখা গেছে বস্তির ভেতরে এখনো ছাই, ভাঙা কাচ, ইট-সুরকি সরানো হয়নি। শিশুদের সেই ধ্বংসস্তূপের ওপরই খেলতে দেখা গেছে। স্বেচ্ছাসেবীরা অভিযোগ করেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ক্ষতিকর বর্জ্য অপসারণ করেনি; স্যানিটেশন সুবিধার জন্য দেওয়া দুইটি মোবাইল টয়লেটও অধিকাংশ সময় বন্ধই থাকে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও পরিবেশকর্মী নয়ন সরকার বলেন, “এখানে আরেক গাজার মতো পরিস্থিতি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যেন কড়াইলকে ভুলে গেছে। বন্যা–ভূমিকম্পে সরকার দ্রুত সাড়া দেয়, কিন্তু কড়াইলের ক্ষেত্রে সেই তৎপরতা নেই।”
এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বলছে পুনর্বাসন তাদের পক্ষে কঠিন, কারণ বস্তিবাসী ‘অবৈধ দখলদার’। নগর পরিকল্পনাবিদরা এই যুক্তিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আকতার মাহমুদ বলেন, “বস্তিবাসী এই নগরীরই অংশ, তারা ভোটার, তারা কর্মজীবী। সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব তাদের পাশে দাঁড়ানো। সরকার তাদের ‘অবৈধ’ বললেও সিটি করপোরেশনের সে অজুহাত নেই।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, “কড়াইল বহু পুরনো বস্তি। বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখা যাবে না। কঠিন হলেও এ কাজ সরকারকেই করতে হবে।”
ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের কাছে পুনর্বাসন পরিকল্পনা জানতে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।