যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামকে তার মৃত স্ত্রী ও নয় মাস বয়সী শিশুসন্তানের জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এই ঘটনাকে সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের “সুস্পষ্ট লঙ্ঘন” হিসেবে অভিহিত করেছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
শনিবার বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রাম থেকে জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা (২২) ও তাদের নয় মাস বয়সী ছেলে নাজিফের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, সুবর্ণাকে ঘরের ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় এবং শিশুটিকে মেঝে থেকে উদ্ধার করা হয়। নিহতের বাবা হত্যা মামলা দায়ের করেছেন, যেখানে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে আবেদন করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি। শনিবার সন্ধ্যায় নিহত স্ত্রী ও শিশুর মরদেহ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে নেওয়া হয়। সেখানে মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য তাদের শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পান সাদ্দাম। এরপর আবার তাকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং রাত সাড়ে এগারটার দিকে বাগেরহাটে মা ও শিশুর দাফন সম্পন্ন হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র এক বিবৃতিতে বলেছে, এই ঘটনা বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১ ও ৩৫(৫)-এর সরাসরি ব্যত্যয়। সংস্থাটির মতে, একজন বিচারাধীন বন্দি হিসেবে সাদ্দাম এসব সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত নন। স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যুর মতো চরম মানবিক পরিস্থিতিতে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া এবং জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের সুযোগ অস্বীকার করা তাকে নিষ্ঠুর ও অবমাননাকর আচরণের শিকার করেছে।
আসক স্মরণ করিয়ে দেয়, ২০১৬ সালের ১ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, সেখানে বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান মৃত্যুবরণ করলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তির সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। এই বিধান প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয় হলেও তা নির্বিচারে বা কোনো কারণ না দেখিয়ে প্রত্যাখ্যান করা যায় না বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও তুলেছে আসক। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (আইসিসিপিআর) ৭ ও ১০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বন্দিদের সঙ্গে মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কারাফটকে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য মৃত স্ত্রী ও শিশুকে দেখিয়ে জানাজা ও দাফন থেকে বঞ্চিত করা এই বিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) পৃথক বিবৃতিতে বলেছে, প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ার বিষয়টি অপরাধ কি না—সে প্রশ্ন এখন সর্বস্তরে উঠেছে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত দাবি করেছে এবং নিহত পরিবারের জন্য মানসিক, সামাজিক ও আইনি সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে।
এ ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখা “মৃত শিশু দেখা করতে গেছে, তার জীবিত পিতার সাথে” বাক্যটি ভাইরাল হয়ে পড়ে। অনেকেই এটিকে রাষ্ট্রের ‘অমানবিক চেহারা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
পরিবারের অভিযোগ, প্যারোলের আবেদন নিয়ে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের কাছে গেলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়নি। অন্যদিকে যশোর জেলা প্রশাসন বলছে, তারা এ ধরনের কোনো আবেদন পাননি। প্রশাসনের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পুরো ঘটনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতির প্রশ্ন তুলেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, আবেদনের প্রক্রিয়ার নামে সময়ক্ষেপণ করে বন্দিকে কারাফটকে লাশ দেখানোর ব্যবস্থা করা এক ধরনের নিষ্ঠুরতা। তারা বলছে, এই ঘটনা একটি গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারসম্মত রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি অপরিহার্য।