যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকা ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী ও শিশুপুত্রের মৃত্যুর পর তাকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাকে ‘অমানবিক ও প্রতিহিংসামূলক আচরণ’ আখ্যা দিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ৩৯ জন বিশিষ্ট নাগরিক।
সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, সাদ্দাম কোনো ফাঁসির আসামি ছিলেন না এবং তার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির প্রশ্নও তেমন ছিল না। আইন অনুযায়ী, নিকট আত্মীয়ের মৃত্যু হলে বন্দির প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ রাজনৈতিক পরিচয় বা মামলার প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে তাকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
বিবৃতিতে নাগরিকরা বলেন, স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পর সাদ্দামের পরিবার বাগেরহাট জেলা প্রশাসন থেকে যশোর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয় পর্যন্ত ঘুরেও কোনো কার্যকর সহায়তা পায়নি। সাপ্তাহিক ছুটি ও আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার অজুহাতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তাঁরা এই আচরণকে ‘নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবিবেচক’ বলে আখ্যা দেন।
নাগরিক সমাজ আরও বলেছে, বিচারপ্রক্রিয়ার নামে এ ধরনের অবহেলা বা প্রতিহিংসামূলক আচরণের দায় অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় যে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটছে না বলেও অভিযোগ তোলা হয়।
এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন সুলতানা কামাল, ইফতেখারুজ্জামান, শহিদুল আলম, সারা হোসেন, রাশেদা কে চৌধূরীসহ দেশের খ্যাতিমান মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ ও আইনজীবীরা।
ঘটনার পটভূমিতে জানা যায়, গত শুক্রবার বাগেরহাটের নিজ বাড়িতে সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুর্বনা স্বর্ণালীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার পাশে পাওয়া যায় নয় মাস বয়সী শিশুপুত্র নাজিমের মরদেহ। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর সাদ্দামের পরিবার প্যারোলে মুক্তির চেষ্টা করলেও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি।
শেষ পর্যন্ত শনিবার সন্ধ্যায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে পরিবারের ছয় সদস্যকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। মাত্র পাঁচ মিনিট সময়ের জন্য স্ত্রী ও সন্তানকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পান সাদ্দাম।
এই ঘটনায় সমালোচনা বাড়লে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত আবেদন করা হয়নি। মৌখিক আবেদনের ভিত্তিতেই কারা ফটকে দেখা করার ব্যবস্থা করা হয় এবং মানবিক বিবেচনায় সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।
তবে এই ব্যাখ্যা নাগরিক সমাজকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার এই ব্যর্থতা শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং মানবিক সংকটেরও প্রতিফলন।
সবশেষে সোমবার হাইকোর্ট মানবিক বিবেচনায় সাদ্দামকে ছয় মাসের জামিন দেন। স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর তিন দিন পর তার জামিন পাওয়ার ঘটনায় বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই ঘটনা কারাবন্দিদের মৌলিক মানবিক অধিকারের প্রশ্নে রাষ্ট্রের অবস্থান নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে।