সর্বশেষ

গভীর মানবিক সংকটে রোহিঙ্গারা

আন্তর্জাতিক সহায়তা অর্ধেকে নেমে এসেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ডাকে সাড়া নেই

প্রকাশিত: ৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৭:১৩
আন্তর্জাতিক সহায়তা অর্ধেকে নেমে এসেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ডাকে সাড়া নেই

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা এখন ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখোমুখি। চলতি বছর রোহিঙ্গা তহবিলে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজনের ৫০ শতাংশেরও কম পাওয়া গেছে। ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, শিক্ষা এবং আশ্রয়সহ প্রতিটি মানবিক খাতে তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দ্রুত সহায়তা বৃদ্ধি না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যা শুধু রোহিঙ্গাদেরই নয় বাংলাদেশের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।

 

সহায়তার অর্ধেকেরও কম মিলেছে

 

জাতিসংঘের ওসিএইচএ–এর ফাইন্যান্সিয়াল ট্র্যাকিং সার্ভিস (এফটিএস) জানায়, ২০২৫ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের আওতায় রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় দরকার ছিল ৯৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। গতকাল পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র ৪৬ কোটি ৪৪ লাখ ডলার যা প্রয়োজনের মাত্র ৪৯.৭ শতাংশ। অর্থাৎ ৪৭ কোটির বেশি ডলার এখনো ঘাটতি।

 

২০২৪ সালের প্ল্যানে প্রয়োজন ছিল ৮৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার। কিন্তু বছরজুড়ে পাওয়া গিয়েছিল ৫৪ কোটি ৬৬ লাখ ডলার, যা মোট প্রয়োজনের ৬৪.১ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরে আন্তর্জাতিক সহায়তা আরও কমেছে।

 

উন্নত বিশ্বসহ দাতাদের মনোযোগ কমে যাচ্ছে

 

জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস মার্চে বাংলাদেশ সফর করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইস্যুটি জোরালোভাবে তোলার আহ্বান জানান। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনেও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। অথচ এত সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও দাতা সংস্থাগুলোর সাড়া কমছে।

 

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ বলছে বিশ্বব্যাপী মানবিক তহবিল কমে গেছে। নতুন যুদ্ধ, নতুন সংকট এবং বৈশ্বিক মনোযোগের বিচ্ছুরণ রোহিঙ্গা ইস্যুকে পেছনে ঠেলে দিয়েছে। ফলে অনেক দাতা সংস্থা সহায়তা কমিয়ে দিচ্ছে বা পুরোপুরি সরে যাচ্ছে।

 

খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্য—সবখানে ভয়াবহ ঘাটতি

 

সহায়তার ঘাটতিতে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে এখন টয়লেট পরিষ্কারক উপকরণ, শিশুদের দুধ, ওষুধ এমনকি মৌলিক খাবারও অনিয়মিত হয়ে গেছে। রেশন অর্ধেকে নেমে আসায় হাজারো পরিবার প্রতিদিন পুষ্টির ঘাটতিতে জীবনযাপন করছে।

 

 

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্প–১৫–এর পুষ্টি কেন্দ্রে প্রতিদিন ৩০০ শিশুর গুরুতর অপুষ্টি পরীক্ষা করা হচ্ছে। আগের বছরের তুলনায় অপুষ্ট শিশুর সংখ্যা বেড়েছে ১১ শতাংশ। নবজাতকরা জন্ম নিচ্ছে এমন পরিবেশে যেখানে স্যালাইন, ভিটামিন এ এবং রেডি–টু–ইউস থেরাপিউটিক ফুডের ঘাটতি প্রকট।

 

গর্ভবতী নারীদের অবস্থা আরও সংকটজনক। নিরাপদ প্রসবের উপকরণ নেই, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার নেই। ফলে কম ওজন নিয়ে জন্মাচ্ছে বেশির ভাগ শিশু।

 

আশ্রয়, পানি, স্যানিটেশন ও শিক্ষা খাতেও বিপর্যয়

 

অস্থায়ী বাঁশ–তেরপলের ঘরগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ঘূর্ণিঝড় বা মৌসুমি বৃষ্টিতে সেগুলো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানি ও স্যানিটেশন খাতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়ছে।

 

শিক্ষা খাতে বাজেট কাটছাঁট হওয়ায় কমিউনিটিভিত্তিক শিক্ষা প্রায় অচল। ২০১৭ সালে আশ্রয় নেওয়া পাঁচ-ছয় বছরের শিশুরা এখন কিশোর বা তরুণ। শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ না থাকায় তাদের বেকারত্ব দ্রুত বাড়ছে।

 

সাংবাদিক তানভিরুল মিরাজ রিপন বলেন, “শিক্ষা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু জ্ঞানগত ঘাটতি নয়, রোহিঙ্গা তরুণদের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সামাজিক বৈষম্য ও দ্বন্দ্বও বাড়বে।”

 

বাংলাদেশের জন্য বাড়ছে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি

 

গবেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, সহায়তা কমে গেলে বাংলাদেশের ওপর বাড়বে অর্থনৈতিক চাপ। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার তাগিদে শিবিরের বাইরে ছড়িয়ে পড়া, চোরাচালান, মানবপাচার এবং মাদক কারবারে জড়ানোর ঝুঁকি বাড়বে।

 

সবচেয়ে বড় উদ্বেগ উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা। হতাশা বাড়লে তরুণদের একটি অংশ সহজেই চরমপন্থী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

 

বিশ্বের মনোযোগ কমে গেলে ফিরে আসবে ২০১৭–র মতো বিপর্যয়

 

মানবিক সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় দাতারা সহায়তা কমিয়ে দেওয়ায় আগামী বছর এ সংকট আরও গভীর হবে। বিশ্ব রোহিঙ্গা ইস্যু ভুলে গেলে আশ্রয় শিবিরে দুর্ভোগ বাড়বে এবং রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তীব্র হবে।

সব খবর

আরও পড়ুন

নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে আসকের তীব্র উদ্বেগ

জানুয়ারিতে ৭৫ সংঘর্ষে নিহত ১১, আহত ৬১৬ নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে আসকের তীব্র উদ্বেগ

ইউনূস আমলে ৬০০ রাজনৈতিক সহিংসতা, ‘৯২ শতাংশ ঘটনায় বিএনপি সম্পৃক্ত’

টিআইবি’র প্রতিবেদন ইউনূস আমলে ৬০০ রাজনৈতিক সহিংসতা, ‘৯২ শতাংশ ঘটনায় বিএনপি সম্পৃক্ত’

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে নাগরিক প্রতিনিধিদল, নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণের দাবি

রাউজানে সংখ্যালঘুদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে নাগরিক প্রতিনিধিদল, নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণের দাবি

জানুয়ারিতে মব সন্ত্রাসে নিহত ২১, বেড়েছে অজ্ঞাত লাশ ও সংখ্যালঘু নির্যাতন

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের উদ্বেগ জানুয়ারিতে মব সন্ত্রাসে নিহত ২১, বেড়েছে অজ্ঞাত লাশ ও সংখ্যালঘু নির্যাতন

মিরসরাইয়ে হিন্দুপাড়ায় এক সপ্তাহে ৭ স্থানে আগুন, আতঙ্কে রাত জেগে পাহারা

সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন মিরসরাইয়ে হিন্দুপাড়ায় এক সপ্তাহে ৭ স্থানে আগুন, আতঙ্কে রাত জেগে পাহারা

‘স্ত্রী-সন্তানের লাশের বিনিময়ে আমাকে জামিন দেওয়া হলো’

কবর জিয়ারত শেষে সাদ্দাম ‘স্ত্রী-সন্তানের লাশের বিনিময়ে আমাকে জামিন দেওয়া হলো’

নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে মানবাধিকার সুরক্ষার আহ্বান

ইউনূসকে অ্যামনেস্টি সেক্রেটারি জেনারেলের চিঠি নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে মানবাধিকার সুরক্ষার আহ্বান

ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা

৩৯ বিশিষ্ট নাগরিকের নিন্দা ও তদন্তের দাবি ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম ইস্যুতে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা