২০২৫ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল অস্থির ও গভীরভাবে উদ্বেগজনক। আইন ও সালিস কেন্দ্র (আসক) প্রকাশিত বার্ষিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির ঘটনায় কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল অন্তত ১২৮ জন যার অধিকাংশই আবার ৫ আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সকালে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে আসক জানায়, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংস্থাটির নিজস্ব পর্যবেক্ষণ এবং সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, মব সন্ত্রাসের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকায় ২৭ জন। এরপর গাজীপুরে ১৭, নারায়ণগঞ্জে ১১, চট্টগ্রামে ৯, কুমিল্লায় ৮ এবং ময়মনসিংহ, বরিশাল, নোয়াখালী ও গাইবান্ধায় ছয়জন করে নিহত হয়েছেন। মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গণপিটুনির ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটেছে। ভুক্তভোগীদের বড় অংশই সাধারণ নাগরিক হলেও সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত সাতজন, তিনজন নারী এবং একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি এই সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক ভিন্নমত, ধর্মীয় উগ্রবাদ, গুজব এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ মব সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে। ‘তৌহিদি জনতা’র নামে মব তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ভাঙচুর, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং ভিন্নমতাবলম্বী ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকাশ্যে হেনস্তার ঘটনাও ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা বা উপস্থিত থেকেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।
২০২৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতাও বেড়েছে। আসকের হিসাব অনুযায়ী, বছরজুড়ে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও অব্যাহত ছিল; কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় অন্তত ৩৮ জন প্রাণ হারান।
কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। চলতি বছরে দেশের কারাগারগুলোতে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৫। এ ছাড়া ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি এবং পারিবারিক সহিংসতার চিত্রও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
আসক বলছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন মানবাধিকার পরিস্থিতিতে ন্যূনতম ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং দমনমূলক আইন, জবাবদিহির অভাব এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনের প্রবণতা পূর্বের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে , যা দেশের আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি।