বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে যখন দীর্ঘ ১৭ বছর পর ‘অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটের’ প্রত্যাশায় দেশের বহু মানুষ আশাবাদী, তখন নারীদের একটি বড় অংশের মধ্যে বাড়ছে ভিন্ন ধরনের উদ্বেগ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী–র পুনরুত্থান নারীর অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর রাজনৈতিক মাঠে বড় পরিবর্তন এসেছে। ইসলামপন্থী বিরোধী দলগুলো প্রথমবারের মতো খোলামেলা প্রচারণা চালানোর সুযোগ পেয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে নতুন করে সংগঠিত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। হাসিনা আমলে নিষিদ্ধ থাকা দলটি এবার ব্যাপকভাবে মাঠে নেমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে দলটি ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোট পেতে পারে এবং সংসদে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকায় মধ্যরাতে মশাল মিছিল করা তরুণীদের একজন সাবিহা শারমিন বলেন, “এই নির্বাচন পরিবর্তনের কথা বলেছিল। কিন্তু আমরা দেখছি নারীদের অধিকারই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। মনে হচ্ছে দেশ ১০০ বছর পিছিয়ে যাবে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াত তাদের ইশতেহারে ‘নারীর নিরাপত্তা’ ও ‘নৈতিক সমাজ’ গঠনের কথা বললেও দলটি একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি। দলটির আমির শফিকুর রহমান অতীতে বলেছেন, নারীরা দল বা রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকতে পারেন না, কারণ তা ‘ইসলামসম্মত নয়’। তিনি বৈবাহিক ধর্ষণের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন।
ঢাকার এক শিক্ষার্থী জায়বা তাহজীব বলেন, “ইরান বা আফগানিস্তানের মতো কথাবার্তা শুনছি। আমাদের স্বাধীনতা ও অধিকার এই নির্বাচনে বাজি রাখা হয়েছে।”
জামায়াতের প্রস্তাবিত নীতির মধ্যে রয়েছে নারীদের কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা থেকে কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টা করা, যাতে তারা বাড়িতে বেশি সময় দিতে পারেন। তবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির ৪৪ শতাংশ নারী, দক্ষিণ এশিয়ায় যা সর্বোচ্চ। ফলে অনেকেই মনে করছেন, এ ধরনের নীতি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করবে।
শুধু জামায়াত নয়, অন্যান্য বড় দলেও নারীর অংশগ্রহণ কম। বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে ৫ শতাংশেরও কম নারী। ছাত্রনেতাদের গড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিও (এনসিপি) শেষ পর্যন্ত জামায়াত জোটে যাওয়ায় হতাশ হয়েছেন অনেক নারী নেতা।
এনসিপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য চিকিৎসক তাজনুভা জাবিন বলেন, “এটা ছিল নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ার ঐতিহাসিক সুযোগ। কিন্তু নারীদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। এই নির্বাচন জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে প্রতিনিধিত্ব করছে না।”
তবে জামায়াতের নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দলটির এক প্রার্থী ব্যারিস্টার মির আহমদ বিন কাসেম আরমান বলেন, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য এবং ‘নারীবাদী’ দাবি সাধারণ মানুষের অগ্রাধিকার নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ ও প্রথমবারের ভোটারদের বড় অংশ প্রচলিত দলগুলোর দুর্নীতি ও বংশানুক্রমিক রাজনীতিতে হতাশ হয়ে জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনকে ঘিরে আশা ও পরিবর্তনের পাশাপাশি নারীর অধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা যা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।