সর্বশেষ

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি উসকে দিতে পারে মূল্যস্ফীতি

প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:০০
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি উসকে দিতে পারে মূল্যস্ফীতি

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রস্তাব করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। এতে মূল বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে বেতন ৮,২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডে ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে গ্রেড সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকবে।

 

বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২১ সদস্যের কমিশন এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সুপারিশ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিকভাবে নতুন কাঠামো কার্যকর হবে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে।  

 

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, বেতন বাড়ানো হলেও বাস্তবে তেমন লাভ হবে না। কারণ বেতন বৃদ্ধির পর বাজারে পণ্যের দাম দেড় থেকে দুইগুণ বেড়ে যেতে পারে। তাদের মতে, বেতন বাড়ানোর চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই বেশি জরুরি। কমিশন সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের চড়া মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় রেখে এই প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। অনলাইনে পরিচালিত জরিপে দুই লাখ ৩৬ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারীর মতামতও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।  

 

নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতার জন্য বাজেটে বরাদ্দ আছে ৮৫ হাজার কোটি টাকা। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে এই ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাবে। কমিশনের প্রস্তাবে বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে যাতায়াত ভাতা ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বাড়িভাড়া ভাতা প্রথম থেকে দশম গ্রেডে তুলনামূলক কম এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে বেশি রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।  

 

পেনশনভোগীরাও বড় সুবিধা পাবেন। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য ৫৫ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য চিকিৎসা ভাতা ১০ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।  

 

বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। বাস্তবে পণ্যের দাম কমেনি, বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। তাই খাদ্য ভর্তুকি ও বাজার কাঠামোতে স্বচ্ছতা আনার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, জনগণ ও অর্থনীতি এ ধরনের ব্যয়ের জন্য প্রস্তুত কি না, তা যাচাই জরুরি। রাজস্ব সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ ছাড়া পে স্কেল বাস্তবায়ন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।  

 

অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ আশ্বস্ত করে বলেছেন, বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়বে না। সরকার সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন একটি জটিল বিষয় এবং সাধারণত এটি পর্যালোচনায় তিন থেকে চার মাস সময় লাগে।  

 

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়লে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি টেকসই হবে না। অর্থনীতি এখনো মজুরি বাড়ানোর মতো সক্ষমতায় পৌঁছায়নি।  

 

সব মিলিয়ে, নতুন পে স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির বার্তা হলেও বিপুল ব্যয় ও রাজস্ব ঘাটতির বাস্তবতায় এটি মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে কি না এটাই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।

সব খবর

আরও পড়ুন

নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনূস সরকারের ‘গোপন’ শুল্ক চুক্তি

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনূস সরকারের ‘গোপন’ শুল্ক চুক্তি

বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি

অচল আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি

কমতে কমতে তলানিতে বিদেশি বিনিয়োগ

ক্ষতবিক্ষত বেসরকারি খাত কমতে কমতে তলানিতে বিদেশি বিনিয়োগ

বেতন বৃদ্ধির বাস্তবতা: কার স্বস্তি, কার চাপ

বেতন বৃদ্ধির বাস্তবতা: কার স্বস্তি, কার চাপ

দোসর খোঁজার নামে বিপর্যস্ত বেসরকারি খাত

বিনিয়োগে ইতিহাস সর্বোচ্চ মন্দা দোসর খোঁজার নামে বিপর্যস্ত বেসরকারি খাত

ব্যয়সাশ্রয়ী নীতির ঘোষণা দিয়ে উল্টো পথে অন্তর্বর্তী সরকার

ব্যয়সাশ্রয়ী নীতির ঘোষণা দিয়ে উল্টো পথে অন্তর্বর্তী সরকার

গাজীপুর ও সাভারে বন্ধ ৩২৭ কারখানা, কর্মহীন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক

গাজীপুর ও সাভারে বন্ধ ৩২৭ কারখানা, কর্মহীন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক

চমক নয়, ব্যর্থতার হিসাবই বড় হয়ে উঠছে বিডার সামনে

নতুন আশা নেই বিনিয়োগে চমক নয়, ব্যর্থতার হিসাবই বড় হয়ে উঠছে বিডার সামনে