আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমলেও দেশের বাজারে উল্টো বাড়ছে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম। সরবরাহ সংকটের কথা বললেও চট্টগ্রাম বন্দরে একের পর এক ভোজ্যতেলবাহী জাহাজ ভিড়ছে। বর্তমানে বন্দরে থাকা সাতটি জাহাজে প্রায় ৩ লাখ ১৪ হাজার টন অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম অয়েল রয়েছে, যা দ্রুত খালাসের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তবু ঈদের আগে বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে থাকায় ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারে গত এক সপ্তাহে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম লিটারে ১৩ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে সকালে এক দামে বিক্রি হওয়া তেল বিকেলে আরও বেশি দামে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীরা সরবরাহ কম থাকার কথা বললেও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ পরিস্থিতি তেমন সংকটপূর্ণ নয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোজ্যতেল ব্যবসা মূলত সাতটি পরিশোধন কারখানার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। গত সপ্তাহেও তাদের কাছে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন এবং পাম অয়েলের মজুত ছিল প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৯ টন। একই সময় চারটি কারখানার জন্য ৫৫ হাজার ৫০০ টন তেল আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে এবং পাইপলাইনে রয়েছে আরও প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টন তেল।
কারখানাগুলো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯ হাজার ১০০ টন ভোজ্যতেল বাজারে সরবরাহ করছে। গত ২১ দিনে তারা মোট ৮৫ হাজার টন তেল সরবরাহ করেছে বলে মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে।
এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম গত এক মাসে প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১ হাজার ৮৩ মার্কিন ডলার, যা আগের সপ্তাহে ছিল ১ হাজার ১১৪ ডলার।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের পাইকারি বাজারে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। খাতুনগঞ্জে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রায় ৬ হাজার ৭০০ টাকা এবং পাম অয়েলের দাম ছিল ৫ হাজার ৭০০ টাকা। গত সপ্তাহে সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে হয় ৭ হাজার ১০০ টাকা এবং পাম অয়েলের দাম হয় ৬ হাজার ৬০ টাকা। চলতি সপ্তাহে তা আরও বেড়ে যথাক্রমে ৭ হাজার ৩০০ টাকা ও ৬ হাজার ২১০ টাকায় পৌঁছেছে।
খুচরা বাজারেও এর প্রভাব স্পষ্ট। চট্টগ্রাম নগরীতে গত দুই সপ্তাহে খোলা সয়াবিন তেলের দাম কেজিতে প্রায় ৯ টাকা বেড়ে ২০২ থেকে ২০৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই সময়ে খোলা পাম অয়েলের দাম কেজিতে ৭ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৩ টাকায়।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম বলেন, মিলগেট থেকে চাহিদামতো তেল সরবরাহ করা হলে বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে। বর্তমানে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে অল্প কিছু ব্যবসায়ী।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। চট্টগ্রামের চৌমুহনী মার্কেটের ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান বলেন, পাইকারি বাজারে চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।
তবে তেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান টি কে গ্রুপের পরিচালক (ফাইন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন) শফিউল আতাহার তসলিম দাবি করেন, সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়লেও মিলগেট থেকে নিয়মিত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের এসব পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে ভোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই সরবরাহ প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে বলে সন্দেহ রয়েছে। তার মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।