সর্বশেষ

দেশে ৩ হাজার স্পট থেকে দৈনিক শতকোটি টাকা চাঁদা আদায়

প্রকাশিত: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:৩৫
দেশে ৩ হাজার স্পট থেকে দৈনিক শতকোটি টাকা চাঁদা আদায়

রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় তিন হাজার স্পট থেকে প্রতিদিন শতকোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। পরিবহণ খাতকে কেন্দ্র করে এই চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত রয়েছে সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভয়ভীতি দেখিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই অর্থ আদায় করা হয়।

  

সারা দেশ থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, কোথাও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার নামে, কোথাও পার্কিংয়ের নামে আবার কোথাও পৌর টোলের সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। পরিবহণ চালক ও মালিকরা নিরুপায় হয়ে বছরের পর বছর এই চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে পরিবহণ ভাড়া বাড়ছে, সবজিসহ নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই এর খেসারত দিতে হচ্ছে।  

 

সড়ক পরিবহণ, সেতু, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, চাঁদা আর চাঁদাবাজি আলাদা বিষয়। চাঁদা স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়, আর চাঁদাবাজি জোরপূর্বক আদায় করা হয়। তিনি জানান, চাঁদাবাজি একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের। প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তবে তাঁর বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।  

 

যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সিটি বাস থেকে দৈনিক প্রায় ৬৪ লাখ টাকা, দূরপাল্লার বাস থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা, ঢাকার সিএনজি অটোরিকশা থেকে প্রায় ২৭ লাখ টাকা, চট্টগ্রামের সিএনজি থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা, ঢাকার ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা এবং দেশের অন্যান্য ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এছাড়া ট্রাক থেকে দৈনিক প্রায় ৪০ কোটি টাকা এবং টেম্পো-লেগুনা থেকে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা আদায় হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন পরিবহণ খাত থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।  

 

অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের সদস্যদের কল্যাণের নামে চাঁদা আদায় হলেও বাস্তবে তা চাঁদাবাজি। চালক-কন্ডাক্টরদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রায় ৯০ ভাগ টাকা আদায় করা হয়। টাকা না দিলে গাড়ি ভাঙচুর বা মারধরের ঘটনাও ঘটে। স্বাধীনতার পর থেকে অনেক নেতা এই অর্থের ওপর ভর করে প্রভাবশালী হয়েছেন, কেউ কেউ এমপি-মন্ত্রীও হয়েছেন। সরকার বদল হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের মধ্যে আপস করে চলেন এবং চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না।  

 

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়কে চাঁদা ও চাঁদাবাজি দুটোই রয়েছে। তিনি মনে করেন, ডিজিটাল ভাড়া পরিশোধ ব্যবস্থা চালু হলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে। তবে অতীতে সরকারগুলো বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখেনি। তাঁর মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত সত্য বের করে আনা জরুরি।  

 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স দুদু জানান, শ্রমিক ফেডারেশনের নামে সরাসরি চাঁদা আদায় বন্ধ হয়েছে, তবে মালিক সমিতি এখনো টাকা তুলছে। তাঁর মতে, নানা নামে চাঁদা আদায় বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, তারা টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার খরচের জন্য স্বেচ্ছায় টাকা নিচ্ছেন, এটাকে চাঁদা বলা যাবে না।  

 

বাংলাদেশ পুলিশের অ্যাডিশনাল আইজি (হাইওয়ে পুলিশ) মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা জানান, মহাসড়কে চাঁদাবাজি নেই বললেই চলে। তবে টার্মিনালকেন্দ্রিক কিছু সমস্যা আছে।  

 

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, পরিবহণ খাতের চাঁদাবাজি শুধু চালক-মালিকদের নয়, পুরো সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ভাড়া ও পণ্যের দাম বাড়ছে, আর সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন এর খেসারত দিতে হচ্ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই সিন্ডিকেট বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।

সব খবর

আরও পড়ুন