বাংলাদেশের জনজীবনে নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছে মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনি। ২০২৫ সালে সারা দেশে মব সন্ত্রাসে প্রাণ গেছে অন্তত ১৮৪ জনের। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দলবদ্ধভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদপত্রে ‘মব’ ও ‘মব জাস্টিস’ শব্দ দুটি আলোচনায় উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত অভিযুক্তকে নিরপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার সবার রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদেও বলা হয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। কিন্তু বাস্তবে মব সন্ত্রাসে এসব অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। গত বছরের আগস্টে ৪৯ জেলায় সংখ্যালঘুদের অন্তত ১,০৬৮টি ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুলিশের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এসব হামলার প্রায় ৯৮ শতাংশ রাজনৈতিক কারণে ঘটেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অন্তত ১৬৮টি ঘটনায় দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে মব সন্ত্রাস চলেছে, অথচ পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ উল্টো মবকারীদের নিরাপত্তা দিয়েছে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মবকারীদের অধিকাংশই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের সময় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় হামলা চালিয়ে প্রায় ১,৮৯৮টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের আওতাধীন ১৪২টি স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়, পুড়িয়ে দেওয়া হয় তিনটি থানা ভবন। সারা দেশে ৬৬৪টি থানার মধ্যে বহু স্থাপনায় হামলা হয়। এসব ঘটনায় পুলিশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় থানায় যেতে সাহস পায়নি। ফলে মব দমনে তারা দ্বিধাগ্রস্ত থাকে।
মব সন্ত্রাসের অধিকাংশ ঘটনায় মামলা হয়নি। মাত্র ১৭টি মামলা হয়েছে, যেখানে ৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু সবাই অল্পদিনের মধ্যে জামিনে মুক্তি পান। কোনো মামলার তদন্তে অগ্রগতি নেই। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার আক্রান্ত হওয়ার পর সরকার ও সুশীল সমাজ সোচ্চার হয়, তবে ততদিনে মব সন্ত্রাস মহামারি আকার ধারণ করেছে। সরকারি হিসেবে এখন পর্যন্ত ৩১ জন গ্রেপ্তার হলেও বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিলে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হতো না।
মব সন্ত্রাসের ঘটনায় বিচার না হওয়া, পুলিশের ভয় ও উদাসীনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে দেশে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার ও সংবিধানের নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও বিচারহীনতার সংস্কৃতি মব সন্ত্রাসকে আরও বিস্তার ঘটাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কঠোর আইন প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার ছাড়া এ সহিংসতা থামানো সম্ভব নয়।