আইসিসির সিদ্ধান্তে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের ছিটকে পড়া এটা শুধু একটি ক্রীড়াবিষয়ক ব্যর্থতা নয়, বরং দেশের ক্রিকেট পরিচালনা ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বড় ধরনের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। ঠিক এমন মুহূর্তেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সামনে আনল বহুদিন দেশের বাইরে থাকা সাকিব আল হাসানকে আবার জাতীয় দলে ফেরানোর প্রসঙ্গ। এই ‘টাইমিং’ই স্পষ্ট করে দেয়, বিশ্বকাপ ব্যর্থতার চাপ সামলাতে বিসিবি সচেতনভাবেই খেলেছে ‘সাকিব কার্ড’।
প্রায় সাত ঘণ্টার ম্যারাথন বোর্ড সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি পরিচালক আমজাদ হোসেন জানালেন, দেড় বছরের বেশি সময় দেশের বাইরে থাকা সাকিবকে আবার বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। অথচ ঠিক আগের দিনই আইসিসি ঘোষণা করেছে, ভারতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জায়গায় খেলবে স্কটল্যান্ড। এমন এক জাতীয় হতাশার দিনে হঠাৎ সাকিব প্রসঙ্গ তোলা নিছক কাকতাল নয়; বরং ব্যর্থতা থেকে দৃষ্টি সরানোর কৌশল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের পর যাকে দেশে ফিরতে দেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার, যার বিরুদ্ধে দেশে মামলা ঝুলছে, তাকে এখন কেন এবং কীভাবে ‘জাতীয় প্রয়োজন’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে? বোর্ডের বক্তব্যে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। আমজাদ হোসেন বলেন, সাকিবের মামলা দেখছেন বোর্ড সভাপতি, আর সরকার দেখবে তার ব্যক্তিগত ইস্যু। অর্থাৎ নিরাপত্তা হুমকি থাকা সত্ত্বেও খেলোয়াড়কে ফেরাতে বোর্ড প্রস্তুত, দায়িত্ব এবং পূর্বে না ফিরতে পারার দায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সরকারের কাঁধে। এতে বিসিবির স্বায়ত্তশাসন ও নৈতিক অবস্থান—দুটিই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
এখানে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকাও বিতর্কের বাইরে নয়। নিরাপত্তা ইস্যু দেখিয়ে বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবেই নেওয়া হয়েছে বলে বোর্ড স্বীকার করছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের কূটনৈতিক ও ক্রীড়াবিষয়ক ক্ষতি নিয়ে কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা সরকার দেয়নি। বরং বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ার পর জনমতের চাপ সামাল দিতে বিসিবিকে সামনে রেখে বিতর্ক ঘোরানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠছে জোরালোভাবে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোথাও দায় স্বীকার নেই। বিসিবি আইসিসির সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে, আরবিট্রেশনে যায়নি, কোনো কৌশলগত ভুলের ব্যাখ্যাও দেয়নি। উল্টো আলোচনার কেন্দ্রে এনে রাখা হয়েছে একজন খেলোয়াড়কে যিনি দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে , যার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
বিশ্বকাপ ব্যর্থতার দায় এভাবে আড়াল করা হলে দেশের ক্রিকেট ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি আরও দুর্বল হবে। ‘সাকিব কার্ড’ খেলিয়ে সাময়িকভাবে আলোচনা ঘোরানো গেলেও, বিসিবি ও অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও অদূরদর্শিতার দায় শেষ পর্যন্ত এড়ানো যাবে না।