চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি পরিচালনার চুক্তি করতে যাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে শ্রমিক-কর্মচারীরা এর বিরোধিতা করে আজ শনিবার থেকে শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। সরকার চুক্তি সম্পন্ন করতে অনমনীয় অবস্থানে রয়েছে এবং দ্রুত প্রক্রিয়া শেষ করছে।
লালদিয়া টার্মিনাল ৪৮ বছর ও পানগাঁও টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হলেও এনসিটির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হচ্ছে। ডিপি ওয়ার্ল্ড দীর্ঘমেয়াদে নয়, বরং ১৫ থেকে ২০ বছরের জন্য পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে। বন্দরের কেনা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি—যেমন কি গ্যান্ট্রি ক্রেন ও রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন—আরও ১৫ থেকে ২০ বছর সচল থাকবে। তাই প্রতিষ্ঠানটি এই সময়সীমায় পরিচালনার আগ্রহ দেখাচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানিয়েছেন, এনসিটিতে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গ্যান্ট্রি ক্রেন রয়েছে, যেগুলো গড়ে ২০ বছর কার্যক্ষম থাকে। তবে চুক্তির মেয়াদ ও শর্ত নিয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এনসিটির আয়ও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। গত পাঁচ অর্থবছরে আয় হয়েছে এক হাজার ৪৯ কোটি থেকে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা পর্যন্ত। একই সময়ে নিট মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫০ কোটি টাকায়। ফলে টার্মিনালটি এখন বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে শ্রমিক নেতারা বলছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড বর্তমান যন্ত্রপাতির পূর্ণ কর্মক্ষমতা ব্যবহার করে পরিচালনা শেষ করতে চায়। পরে মেয়াদ বাড়ালে নতুন যন্ত্রপাতি কিনে আবার পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘ সময় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকায় বন্দর কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে বড় চ্যালেঞ্জে পড়বে।
গণসংহতি আন্দোলনের চট্টগ্রাম জেলার প্রধান সমন্বয়কারী হাসান মারুফ রুমি বলেন, এনসিটি একটি আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ টার্মিনাল। বর্তমান ট্যারিফ কাঠামো অনুযায়ী বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিটি কনটেইনারে গড়ে ১০০ ডলার নিট আয় করে। কিন্তু ডিপি ওয়ার্ল্ড শুরুতে মাত্র ৬৫ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। মূল্যায়ন কমিটি ১০০ ডলারের বেশি দাবি করেছে এবং এখনও সেই দাবিতে অনড় রয়েছে।
বন্দরের সাবেক বোর্ড মেম্বার জাফর আলম মনে করেন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণে বিদেশি বিনিয়োগ ইতিবাচক হলেও এনসিটির মতো বিদ্যমান আধুনিক টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে দেওয়া উচিত নয়।
এদিকে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী চুক্তিতে কোনো বাধা নেই বলে জানানো হয়েছে। তবে শ্রমিকদের বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বন্দর। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আজ শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত আট ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিক ও কর্মচারীরা। কর্মবিরতির কারণে বন্দরের বিভিন্ন জেটিতে কনটেইনার ও কার্গো ওঠানো-নামানোর কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এবং সাবেক বন্দর সিবিএ নেতাদের ডাকে এই কর্মসূচি চলছে। তারা ঘোষণা দিয়েছেন, আগামীকালও একইভাবে আট ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করবেন।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতির অপারেটররা কাজ বন্ধ রাখায় পরিবহন কার্যক্রম থেমে আছে। জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) টার্মিনালের তিনটি জেটিতে নোঙর করা জাহাজের পণ্য ওঠানো-নামানোও বন্ধ হয়ে গেছে।
বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেন, “শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রাখায় আমরা আমাদের নিয়োজিত জেটি শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাতে পারছি না। বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অপারেটররাও জিসিবিতে কাজ করছেন না।”
এনসিটি বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও বিক্ষোভ হয়েছে। রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ‘স্টুডেন্টস ফর সভরেন্টি’ সংগঠনের কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, জাতীয় সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।
সব মিলিয়ে, এনসিটি চুক্তি নিয়ে সরকার ও শ্রমিকদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হচ্ছে। ভোটের আগেই চুক্তি সম্পন্ন করার তড়িঘড়ি পদক্ষেপে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়ছে।