পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সরকার পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রিতে চালু থাকা রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও দেশের বিভিন্ন জেলায় এখনও স্বাভাবিক হয়নি জ্বালানি সরবরাহ। রাজশাহী ও সাতক্ষীরাসহ কয়েকটি জেলায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের সংকট অব্যাহত থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চালক ও সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে সেচ পাম্প চালাতে ডিজেল না পেয়ে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় আছেন কৃষকরা।
রোববার (১৬ মার্চ) থেকে জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে। এর আগে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত দেশের সব ফিলিং স্টেশনে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে। তবে কেউ জ্বালানি মজুত করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় এখনও জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। অনেক পাম্পে তেল না পেয়ে চালকদের এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ঘুরতে হচ্ছে। যেসব পাম্পে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
সোমবার রাজশাহী নগরী ও পবা উপজেলার বায়া ভূগরোইল, নওহাটা বাজার, শাহ মখদুম বিমানবন্দর এলাকা এবং নগরীর গুল গফুর পেট্রল পাম্পসহ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি। অনেক চালককে এক ঘণ্টার বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
নওহাটা বাজার এলাকার রুচিতা ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা মোটরসাইকেল চালক শাহিন মিয়া বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। বাইকে তেল না থাকলে অফিসের কাজে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। গত কয়েক দিনের তুলনায় লাইনের চাপ কিছুটা কমলেও এখনও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি বলেও জানান তিনি।
রাজশাহী জেলা পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ৪৪টি পেট্রল পাম্প রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় কম জ্বালানি সরবরাহ হওয়ায় অধিকাংশ পাম্পে চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পাম্প মালিকদের দাবি, প্রয়োজনের প্রায় অর্ধেক জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে অনেক পাম্প সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা। ইরি মৌসুমে ধান চাষে সেচের জন্য ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু ডিজেল না পাওয়ায় অনেক জমিতে সময়মতো পানি দেওয়া যাচ্ছে না।
পবা উপজেলার চরখানপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, ধানের জমিতে পাঁচ-ছয় দিন ধরে পানি দেওয়া সম্ভব হয়নি। পানির অভাবে জমির মাটি ফেটে যাচ্ছে। গত কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন পাম্পে ঘুরেও তিনি ডিজেল পাননি। পাম্প কর্তৃপক্ষ প্রতিদিনই ‘আগামীকাল তেল আসবে’ বলে জানাচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তেল মিলছে না।
এদিকে সাতক্ষীরাতেও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল না পেয়ে সাধারণ মানুষ, পরিবহন চালক এবং কৃষকরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেককে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৫ মার্চ রাতে পাম্পে তেল আসবে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে ইফতারের পর থেকেই শত শত মানুষ ফিলিং স্টেশনে ভিড় করেন। রাত ২টা থেকে আড়াইটার দিকে কেউ কেউ তেল পেলেও অনেকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তেল পাননি।
সাতক্ষীরা শহরের এ.বি. খান ফিলিং স্টেশন, আলিপুর ফিলিং স্টেশন, সোনালী ফিলিং স্টেশন, ইউরেনিয়াম ফিলিং স্টেশন ও সংগ্রাম ফিলিং স্টেশন এলাকায় একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও তেল সরবরাহ বন্ধ, আবার কোথাও সীমিত আকারে তেল দেওয়া হচ্ছে। অনেক পাম্পে তেল শেষ হওয়ার কথা জানিয়ে গেট বন্ধ রাখা হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব কতটা তীব্র তা বোঝা যায় একটি মর্মান্তিক ঘটনায়। স্থানীয়দের মতে, ময়নাতদন্তের জন্য আনা একটি মরদেহ বহনকারী ইঞ্জিনভ্যান দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার মতো ডিজেল না পেয়ে পাম্পের সামনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়।
চালকদের অভিযোগ, সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বোতলে করে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি করছেন। মোটরসাইকেল চালক আলতাফ হোসেন বাবু বলেন, সরকার বলছে তেলের সংকট নেই, কিন্তু বাস্তবে পাম্পে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। অনেকেই ভবিষ্যতের আশঙ্কায় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুত করছেন।
চালক রায়হান সিদ্দিক বলেন, ইফতারের পর থেকেই পাম্পে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকেই তেল পাচ্ছেন না।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি বন্ধ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষি মৌসুমে সেচ কার্যক্রম সচল রাখতে দ্রুত পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।