বাংলাদেশে এখন তথ্যের যুগ। তথ্য উপদেষ্টা বলিয়াছেন, “আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মত প্রকাশের জন্য কোনো সাংবাদিককে জেলে যাইতে হয় নাই।” শুনিয়া জনগণ বলিতেছে, “তাহা হইলে জেলখানার তালা খুলিয়া সাংবাদিকেরা নিজেরাই ঢুকিয়াছিলেন কি?”
তিনি আরও বলিয়াছেন, “আনিস আলমগীর ও মঞ্জুরুল আলম পান্নাকে মত প্রকাশের জন্য জেলে নেয়া হয় নাই।” শুনিয়া সাংবাদিক মহল বলিতেছে, “তাহা হইলে আমরা যাহারা গিয়াছি, তাহারা কি মত প্রকাশ করিতেছিল না, না কি মুত বিসর্জন করিতেছিল?”
রাষ্ট্রযন্ত্র নিশ্চয়ই ভিন্ন কোনো তথ্য রাখে। কারণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি বলিতেছে, “দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও কারাবরণের ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় বাড়িয়াছে।”
রাইটস এন্ড রিস্কস অ্যানালাইসিস গ্রুপ বলিতেছে, “প্রথম আট মাসে ৬৪০ জন সাংবাদিক টার্গেট হইয়াছেন।” তাহাদের মধ্যে কেউ মামলা খাইয়াছেন, কেউ মার খাইয়াছেন, কেউ প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন হারাইয়াছেন, কেউ অর্থ গোয়েন্দার তদন্তে পড়িয়াছেন।
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য শুনিয়া গবেষক মহল বসিয়া পড়িয়াছে। তাহারা বলিতেছে, “এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ কী?” কেউ বলিতেছে, “উনি হয়তো ‘মত প্রকাশ’ বলিতে ‘মত প্রকাশের অনুমতি’ বুঝাইয়াছেন।” কেউ বলিতেছে, “উনি হয়তো ‘জেল’ বলিতে ‘আত্মশুদ্ধির কেন্দ্র’ বুঝাইয়াছেন।” কেউ বলিতেছে, “উনি হয়তো ‘সাংবাদিক’ বলতে ‘সাংবাদিক না’ বুঝাইয়াছেন।”
এইরূপে তথ্যের তাফসির চলিতেছে। একদিকে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস বলিতেছে, “পুলিশের হাতে মারধর, রাজনৈতিক কর্মীদের হামলা, সংবাদপত্র অফিসে আক্রমণ বাড়িয়াছে।” অন্যদিকে তথ্য উপদেষ্টা বলিতেছেন, “আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করিয়াছি। সফলতা বা ব্যর্থতা বলিবার কিছু নাই।” শুনিয়া জনগণ বলিতেছে, “তাহা হইলে ব্যর্থতাই সফলতা?”
তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য যদি সত্য হয়, তাহা হইলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে জেলে পাঠানো উচিত। তাহারা মিথ্যা তথ্য ছড়াইতেছে। তাহারা বলিতেছে, “সাংবাদিক নির্যাতিত।” অথচ উপদেষ্টা বলিতেছেন, “সাংবাদিক নির্ভীক।” তাহারা বলিতেছে, “মত প্রকাশে বাধা।” অথচ উপদেষ্টা বলিতেছেন, “মত প্রকাশে উৎসাহ।”
এইরূপে তথ্যের তাফসিরে জাতি বিভ্রান্ত। কেউ বলিতেছে, “তথ্য উপদেষ্টা তথ্য হারাইয়াছেন।” কেউ বলিতেছে, “তথ্য উপদেষ্টা তথ্যের উপদেষ্টা নন, তথ্যের প্রতিপক্ষ।” কেউ বলিতেছে, “তথ্য উপদেষ্টা তথ্যের বদলে তাফসির দিতেছেন।”
এদিকে সাংবাদিকেরা বলিতেছেন, “আমরা মত প্রকাশ করিয়াছি, কিন্তু মত প্রকাশের পর মতামত হারাইয়াছি।” কেউ বলিতেছে, “আমার কলম ছিল, এখন কলমের বদলে কোর্টের হাজিরা।” কেউ বলিতেছে, “আমার রিপোর্ট ছিল, এখন রিপোর্টের বদলে রিমান্ড।”
তাই এখন প্রয়োজন একখানা “তথ্য তাফসির কমিশন”। এই কমিশন ঠিক করিবে কোন তথ্য সত্য, কোন তথ্য উপদেষ্টা, কোন তথ্য উপদেষ্টার উপদেষ্টা, আর কোন তথ্য জনগণের তথ্য।
এই কমিশন বলিবে, “আনিস আলমগীর জেলে যান নাই, কিন্তু জেলের ছায়া তাঁহার উপর পড়িয়াছিল। পান্না মত প্রকাশ করিয়াছেন, কিন্তু মত প্রকাশের পর মতামত প্রকাশ করিতে পারেন নাই। বাকিরা মত প্রকাশ করিয়াছেন, কিন্তু মত প্রকাশের পর মত হারাইয়াছেন।”
এইভাবে চলিতেছে তথ্যের তাফসির, মতের মিছিল, সাংবাদিকের শোকগাথা। তথ্য উপদেষ্টা বলিতেছেন, “আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করিয়াছি।” জনগণ বলিতেছে, “আমরা সর্বোচ্চ ধৈর্য ধরিয়াছি।” সাংবাদিক বলিতেছেন, “আমরা সর্বোচ্চ রিমান্ড খাইয়াছি।”
লেখকঃ এক ক্লান্ত পেনসিল; তথ্যের তফসির মিলাইতে তবদা খাইয়াছি