নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শুধু সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদ করছেন না; তিনি এমন এক ভাষ্য দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন, যেখানে সীমান্ত অপরাধ, মাদক পাচার ও চোরাচালানের প্রশ্ন তুললেই সেটিকে “ভারতের বয়ান” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে তিনি কার্যত সীমান্ত অপরাধীদের জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈধতা উৎপাদনের কাজ করছেন।
বাংলাদেশের সীমান্ত বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। ইয়াবা, ফেন্সিডিল, অস্ত্র, স্বর্ণ, মানবপাচার ও নকল পণ্যের সিন্ডিকেট বহু বছর ধরে সীমান্তকে ব্যবহার করছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে কোটি কোটি টাকার মাদক ও চোরাচালান পণ্য জব্দ করছে। হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হচ্ছে। অর্থাৎ “চোরাচালান বলে কিছু নেই” অথবা “সবাই নিরীহ” এই বয়ান বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু পাটোয়ারীর বক্তব্যের রাজনৈতিক প্রভাব দাঁড়াচ্ছে ঠিক সেখানেই। তিনি এমন এক আবেগীয় পরিবেশ তৈরি করতে চাইছেন, যেখানে সীমান্তে নিহত কেউ চোরাকারবারি হতে পারে, এই সম্ভাবনাটিই নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ কোনো অপরাধী চক্র টিকে থাকে শুধু টাকার জোরে নয়; টিকে থাকে সামাজিক সহানুভূতি, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও নৈতিক বিভ্রান্তির মাধ্যমে। যখন একজন রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে বলেন, নিহতদের “চোরাকারবারি” বলা মানে “ভারতের বয়ান” প্রচার করা, তখন তিনি মূলত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অপরাধী শনাক্ত করার নৈতিক অধিকার থেকেই বঞ্চিত করতে চান। এর ফল কী? সীমান্তের মাদক সিন্ডিকেট বুঝে যায়, তাদের জন্য রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, পাটোয়ারী সীমান্ত হত্যার মানবিক ইস্যুকে ব্যবহার করে সীমান্ত অপরাধের বাস্তবতাকে আড়াল করছেন। অথচ এই মাদকই বাংলাদেশের হাজার হাজার পরিবার ধ্বংস করছে। ইয়াবা ও ফেন্সিডিলের টাকায় সংগঠিত অপরাধ, সন্ত্রাস ও স্থানীয় সিন্ডিকেট শক্তিশালী হচ্ছে। সীমান্তের দরিদ্র মানুষদের “ক্যারিয়ার” হিসেবে ব্যবহার করে যে গডফাদাররা কোটি কোটি টাকা আয় করছে, তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য কোথায়? কেন সেই সিন্ডিকেটের নাম উচ্চারিত হয় না?
একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার কাজ হওয়া উচিত ছিল দুইটি অবস্থান একসঙ্গে নেওয়া: একদিকে সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি, অন্যদিকে চোরাচালান ও মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান। কিন্তু পাটোয়ারীর বক্তব্যে দ্বিতীয় অংশটি অনুপস্থিত। বরং তার বক্তব্যের কাঠামো এমন যে, সীমান্ত অপরাধের প্রসঙ্গ তোলাটাই যেন অপরাধ। এখানেই তিনি অজান্তে বা সচেতনভাবেই চোরাচালানের বৈধতা উৎপাদনকারী রাজনৈতিক কণ্ঠে পরিণত হচ্ছেন।
সীমান্তে যারা মাদক বহন করে, তারা সবসময় সিন্ডিকেটের মূল হোতা নয়; অনেকেই দরিদ্র, ব্যবহৃত মানুষ। কিন্তু সেই বাস্তবতা মেনে নিয়েও এটা অস্বীকার করা যায় না যে তারা একটি অপরাধ অর্থনীতির অংশ। এই বাস্তবতাকে ঢেকে দিয়ে আবেগীয় জাতীয়তাবাদ তৈরি করা শেষ পর্যন্ত সীমান্ত অপরাধকেই রক্ষা করে।
বাংলাদেশের সীমান্ত এখন শুধু ভৌগোলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক নিরাপত্তা, যুবসমাজের ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। ফলে সীমান্ত হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি রাজনৈতিকভাবে এমন বয়ান তৈরি হয়, যা মাদক ও চোরাচালান চক্রকে নৈতিক আড়াল দেয়, তাহলে সেটি কোনো দায়িত্বশীল রাজনীতি নয়। সেটি সীমান্ত বাস্তবতার বিপজ্জনক বিকৃতি।