জুলাই ২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন শহর ও জেলায় সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ১৫ থেকে ২১ জুলাইয়ের মধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ একাধিক এলাকায় রাজনৈতিক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সূত্র ও রাজনৈতিক পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলার লক্ষ্যবস্তু হন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কমিশনের কার্যক্রম স্থগিত ও পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সহিংসতার ঘটনার তদন্তে ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে সরকার এক সদস্যবিশিষ্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানকে কমিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই দেশের বিভিন্ন স্থানে ছয়জন নিহত হওয়া এবং সাম্প্রতিক সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত করে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তদন্তে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান। ৩১ জুলাই বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা চাওয়া হয়েছে এবং তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে আরও বিচারক ও জনবল যুক্ত করা হয়েছে। তিনি সহিংসতাকে “ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ” আখ্যা দিয়ে বলেন, প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনাই সরকারের লক্ষ্য।
তবে পরবর্তী সময়ে কমিশনের কার্যক্রম কার্যত স্থগিত হয়ে যায়—এমন অভিযোগ তুলেছেন রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট একাধিক পক্ষ। তাদের দাবি, ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কমিশনের কাজ আর এগিয়ে নেয়নি। ফলে অনেক হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যায় এবং হতাহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালের ২২ মে তদন্ত কমিশনের প্রধান বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানকে হাইকোর্টের বিচারক পদ থেকেই অপসারণ করে ইউনূস সরকার।
এই প্রেক্ষাপটে কিছু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধেও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, ওই প্রতিবেদনে ঘটনাস্থল, নিহতদের পরিচয় ও সহিংসতার প্রেক্ষাপট পর্যাপ্তভাবে যাচাই না করেই তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর দায় চাপানোর প্রবণতা দেখা গেছে। তারা বলছেন, এতে তদন্তের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রের ভিত্তিতে নিহত ও আহতদের একটি নামের তালিকাও প্রকাশিত হয়েছে। তালিকায় ঢাকা, গাজীপুর, নরসিংদী, নওগাঁ, পটুয়াখালী ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের নাম রয়েছে। তবে এসব নাম সরকারি যাচাই বা চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত নয় বলে সংশ্লিষ্টরা স্পষ্ট করেছেন। পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে অনেক ঘটনার প্রকৃত বিবরণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনও অস্পষ্ট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তদন্ত কমিশনের কার্যক্রম স্থগিত এবং বিতর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশ ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তারা বলছেন, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তদন্ত ছাড়া প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব নয় এবং এতে রাজনৈতিক বিভাজন ও আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।
মানবাধিকার ও সুশাসন বিশেষজ্ঞরাও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কমিশনের কাজ বন্ধ থাকায় সহিংসতার দায় নির্ধারণে বাধা সৃষ্টি হয়েছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তারা জোর দিয়ে বলেন, স্বচ্ছ, স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য তদন্তই দেশের স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—অন্তর্বর্তী সরকার আদৌ কি এই সহিংসতার পূর্ণ সত্য ও দায় নির্ধারণ চেয়েছিল? রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের একাংশ মনে করছেন, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন হঠাৎ করে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া কোনো প্রশাসনিক দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তাদের যুক্তি, যদি ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতাই মূল লক্ষ্য হতো, তবে কমিশনের কার্যক্রম বন্ধ না রেখে বরং তা শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হতো।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন শীর্ষ অংশীজন, এমনকি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও একাধিক বক্তব্যে স্বীকার করেছেন যে জুলাই–আগস্টের আন্দোলন, সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত। এই স্বীকারোক্তির পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—যদি ঘটনাগুলো পূর্বপরিকল্পিত হয়ে থাকে, তবে সেই পরিকল্পনার নেপথ্যের শক্তি, সমন্বয়কারী ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের পরিচয় প্রকাশ পেলে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতেন?
সমালোচকদের ধারণা, কমিশনের তদন্ত এগোলে শুধু সহিংসতার ঘটনাই নয়, আন্দোলনের সংগঠন, অর্থায়ন, রাজনৈতিক কৌশল এবং পরবর্তী ক্ষমতার পরিবর্তনের যোগসূত্রও সামনে আসতে পারত। সে ক্ষেত্রে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু অংশীজন বা তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এই বাস্তবতা থেকেই, তারা মনে করেন, কমিশন কার্যত ‘ডিকমিশন’ করে দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার ও সুশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্ত বন্ধ হওয়া কেবল অতীতের অপরাধ ঢাকার ঝুঁকি তৈরি করেনি, ভবিষ্যতের জন্যও একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কারণ এতে বার্তা যায়—রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় সহিংসতা ও প্রাণহানির পূর্ণ জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে পর্যবেক্ষকদের একটি বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে: অন্তর্বর্তী সরকার কি সত্যিই ন্যায়বিচার ও সত্য উদঘাটন চেয়েছিল, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ক্ষমতার সমীকরণ রক্ষাই ছিল প্রধান অগ্রাধিকার? কমিশন বাতিল হওয়ার সিদ্ধান্তের পূর্ণ ব্যাখ্যা আজও না আসায় এই সন্দেহ আরও গভীর হচ্ছে—এবং সেটিই হয়তো জুলাই ২০২৪-এর সহিংসতা তদন্তের সবচেয়ে বড় অনিষ্পন্ন প্রশ্ন।