সর্বশেষ

মানবাধিকারকর্মীদের গভীর উদ্বেগ

রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা মব সহিংসতায় হত্যার চেয়েও শিশু হত্যার ঘটনা বেশি

প্রকাশিত: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০
রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা মব সহিংসতায় হত্যার চেয়েও শিশু হত্যার ঘটনা বেশি

রাজনৈতিক সহিংসতা, মব জাস্টিস কিংবা কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে দেশে নিয়মিত আলোচনা হলেও পরিসংখ্যান বলছে এসবের চেয়েও ভয়াবহ মাত্রায় ঘটছে শিশু হত্যাকাণ্ড। প্রতি বছর শত শত শিশু ধর্ষণ, অপহরণ ও নির্মম নির্যাতনের পর হত্যার শিকার হচ্ছে, যা বাংলাদেশে একটি গভীর মানবাধিকার সংকটের চিত্র তুলে ধরছে।

 

গত বছরের ১৩ মার্চ মারা যায় শিশু আছিয়া। বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয় বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বোনের শ্বশুর তাকে ধর্ষণ করে এবং এতে সহায়তা করে শিশুটির বোনের স্বামী। ঘটনা জানার পর পরিবারের একাধিক সদস্য বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং শিশুটিকে হত্যাচেষ্টা চালানো হয়। ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও পরে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হলেও একাধিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর আছিয়ার মৃত্যু হয়।

 

এর আগের বছর দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে সিলেটের পাঁচ বছরের শিশু মুনতাহা হত্যাকাণ্ড। অপহরণের পর তাকে হত্যা করে লাশ ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়। তদন্তে উঠে আসে, প্রতিবেশী গৃহশিক্ষকই পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

 

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে রাজনৈতিক হত্যার সংখ্যা ছিল ১৫৭টি, মব সহিংসতায় ২৮টি এবং কারা হেফাজতে মৃত্যু ৮১টি। অথচ একই বছরে শিশু হত্যার ঘটনা ঘটে ৫৯৬টি। ২০২২ সালে শিশু হত্যা হয় ৫১৬টি, ২০২৩ সালে ৪৮৫টি, ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭৫টিতে এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে (এ পর্যন্ত) সংখ্যা ৪১০টি—যেখানে রাজনৈতিক হত্যার ঘটনা ১০২টি। এসব তথ্য জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে সংকলন করেছে আসক।

 

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ধর্ষণের পর হত্যা, অপহরণের পর হত্যা এবং পারিবারিক পরিসরে শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক অবক্ষয় ও দুর্বল শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার ফল। দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা বারবার একই সহিংসতায় জড়াচ্ছে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী মনে করেন, পরিবার ও আত্মীয়তার ভেতরেই শিশু হত্যার ঘটনা বাড়ছে, যা সমাজের গভীর বৈপরীত্য ও সভ্যতার পশ্চাৎপদতার ইঙ্গিত দেয়। রাষ্ট্র যখন শিশুকে কার্যত অনিরাপদ ঘোষণা করেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না, তখন তা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারই প্রকাশ।

 

অধিকারকর্মী গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, শিশু হত্যাকে আমরা সামাজিকভাবে গুরুত্ব দিই না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুর মৃত্যুর সঠিক নিবন্ধনও হয় না। ফলে অপরাধীরা কঠোর বিচারের মুখে পড়ে না।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু হত্যা রোধে শক্তিশালী শিশু সুরক্ষা কাঠামো, দ্রুত বিচার, পরিবার ও কমিউনিটির সক্রিয় নজরদারি এবং নিরাপদ সামাজিক ও ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। শিশুদের জীবন রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব—এ থেকে সরে আসার সুযোগ নেই।

সব খবর