দিনাজপুর জেলা কারাগারে বন্দি অবস্থায় অসুস্থ হয়ে সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী ও ঠাকুরগাঁও–১ আসনের পাঁচবারের নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন মারা গেছেন। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টা ২৯ মিনিটে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, সকালে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সকাল ৯টা ১০ মিনিটে তাকে জেলা কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দিনাজপুর জেলা কারাগারের জেলার মো. ফরহাদ সরকার বলেন, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট ঠাকুরগাঁও থানা পুলিশ তাকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায় এবং পরদিন দিনাজপুর জেলা কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। তিনি হত্যাসহ তিনটি মামলায় বন্দি ছিলেন। তবে দলীয় নেতাকর্মী ও পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগা এই প্রবীণ নেতার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা হয়নি।
রমেশ চন্দ্র সেন ১৯৪০ সালের ৩০ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৭ সালের উপনির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ সদস্য হিসেবে যাত্রা শুরু করে তিনি ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালেও নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের সাবেক এই প্রেসিডিয়াম সদস্য বিভিন্ন সময়ে খাদ্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
তার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ধারাবাহিক মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে এটি নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই ঘটনা হেফাজতে মৃত্যুর উদ্বেগজনক ধারারই অংশ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের কারাগারে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৬৯ জনই ছিলেন বিচারাধীন বন্দী।

সংগঠনগুলোর দাবি, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কারাগার বা পুলিশ হেফাজতে পঞ্চাশাধিক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। বগুড়ায় এক মাসে চারজন, নওগাঁয় এক সপ্তাহে সাতজন, গাইবান্ধার তারিক রিফাত, মুন্সীগঞ্জের সারোয়ার হোসেন নান্নু, কাশিমপুরের ওয়াসিকুর রহমান বাবুসহ আরও অনেকের মৃত্যুর ঘটনা আলোচনায় এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ‘হৃদ্রোগ’ বা ‘পূর্ব-অসুস্থতা’র কথা বললেও স্বজন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো নির্যাতন, চিকিৎসা অবহেলা ও পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ তুলে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানাচ্ছে।
রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যু রাজনৈতিক বন্দিদের নিরাপত্তা, চিকিৎসার অধিকার, জামিনের সুযোগ, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং কারাগারের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান নিয়ে জাতীয় বিতর্ক আরও তীব্র করেছে। মানবাধিকার কর্মীদের ভাষায়, “রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা প্রত্যেক নাগরিকের জীবন রক্ষার পূর্ণ দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।”