আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী সততা ও গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ভোট কারচুপির প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে এবার মূল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ‘ডিজিটাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ ঘিরে, যা সরাসরি বেআইনি না হলেও ভোটারদের মনস্তত্ত্ব প্রভাবিত করে নির্বাচনের ফলাফল বদলে দিতে পারে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্রে ‘ইলেক্টোরাল ইন্টিগ্রিটি: ফ্রম ক্যাম্পেইনিং টু ভোট কাউন্টিং অ্যান্ড দ্য রেজাল্ট ডিক্লেয়ারেশন’ শীর্ষক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। পলিটিক্যাল অ্যান্ড পলিসি সায়েন্স রিসার্চ ফাউন্ডেশন (পিপিএসআরএফ) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে কৌশলগত অংশীদার ছিল ইউনেস্কো, বাংলাদেশ পলিটিকাল সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিল। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন।
সেমিনারের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন পিপিএসআরএফ চেয়ারম্যান ও ঢাবি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, “নির্বাচনী সততাই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু ভোটের দিনের বিষয় নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।”
তিনি ‘লিগ্যাল ডিজিটাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামে নতুন একটি ধারণার কথা তুলে ধরে জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, কমিউনিটি প্ল্যাটফর্ম এবং অ্যালগরিদমভিত্তিক টুল ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ভোটার গোষ্ঠী—বিশেষ করে অনির্ধারিত ভোটারদের—টার্গেট করা হতে পারে। এতে কখনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে মত গঠন, আবার কখনো প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরকে মনোবলহীন করার কৌশল নেওয়া হয়। ফলে ফলাফল ঘোষণার আগে এর প্রভাব বোঝা কঠিন হলেও শেষ পর্যন্ত ভোটের মার্জিন বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরালদ গুলব্রান্ডসন নরওয়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, উন্মুক্ত বিতর্ক এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। জাতীয় টেলিভিশনে নেতাদের প্রকাশ্য বিতর্ক ও স্কুলভিত্তিক অংশগ্রহণমূলক কর্মসূচি ভোটার সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক।
ইউনেস্কোর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ সুজান ভাইজ বলেন, সাইবার নিরাপত্তা এখন নির্বাচনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগে নির্বাচন কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও অভিযোজন জরুরি।
শ্রীলঙ্কার কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জর্জ কুক শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর ও ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্তগ্রহণকে গণতন্ত্রের শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
সেমিনারে বক্তারা একমত হন—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।