সর্বশেষ

সীমান্তে আফনানের মৃত্যু

রাজনীতির দ্বিচারিতা ও রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা

প্রকাশিত: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩০
রাজনীতির দ্বিচারিতা ও রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা

মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত টেকনাফের সেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে রাজধানীর জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হুজাইফা সুলতানা আফনানের মৃত্যু হয়। গত ১১ জানুয়ারি সকালে বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে ছোড়া গুলিতে আহত হয় শিশুটি।

 

বাংলাদেশের সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়ে শিশু আফনানের মৃত্যু যেন আবারও আমাদের রাজনীতির নগ্ন ভণ্ডামি উন্মোচন করল। ফেলানী হত্যার পর ভারতবিরোধী আবেগে উত্তাল হয়েছিল রাজনীতি, রাস্তায় নেমেছিল মানুষ। ভারতকে শত্রু বানিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটেছিল দলগুলো। কিন্তু মায়ানমারের সীমান্তে যখন রক্ত ঝরছে, শিশু আফনানদের জীবন নিভে যাচ্ছে, তখন সেই একই রাজনীতি নীরব। যেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নাম যদি ভারত হয়, তবে রক্তের দাম আছে; আর যদি মায়ানমার হয়, তবে রক্ত শুধু মাটিতে মিশে যায়।

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতবিরোধিতা এক প্রাচীন অস্ত্র। ফেলানীর ঝুলন্ত লাশকে কেন্দ্র করে ভারতকে শত্রু বানিয়ে জনমত উত্তেজিত করা হয়েছিল। রাজনৈতিক বক্তৃতায় ভারতকে দোষারোপ করে জনতার আবেগকে উসকে দেওয়া হয়েছিল। ধর্মীয় উস্কানি, জাতীয়তাবাদের ঢোল—সবই বাজানো হয়েছিল ভারতবিরোধী সুরে। কিন্তু সেই আবেগের নিচে চাপা পড়েছিল বাস্তবতা: সীমান্তে প্রতিদিনই মানুষ মারা যায় আর সেই মানুষগুলো সাধারণ গ্রামবাসী, শিশু, নারী।

 

কিন্তু মায়ানমারের সীমান্তে যখন গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে পাহাড়ি জনপদ, তখন রাজনীতি নীরব। রোহিঙ্গা সংকট, সীমান্তে অনুপ্রবেশ, গুলিবর্ষণ—সবই বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি। শিশু আফনান সেই রক্তক্ষয়ী বাস্তবতার শিকার। কিন্তু তার মৃত্যুতে কোনো রাজনৈতিক উত্তেজনা নেই, নেই কোনো মিছিল, নেই কোনো ভারতবিরোধী স্লোগান। কারণ মায়ানমারকে শত্রু বানিয়ে রাজনীতি করা যায় না, ভোটের বাজারে তার দাম নেই।

 

এটাই বাংলাদেশের রাজনীতির দ্বিচারিতা। ভারতবিরোধী আবেগকে জিইয়ে রাখা হয়, কারণ তা দিয়ে জনতাকে উত্তেজিত করা যায়। কিন্তু মায়ানমারের সীমান্তে যখন রক্ত ঝরে, তখন সেই রক্ত রাজনীতির বাজারে বিক্রি হয় না। আফনানদের মৃত্যু তাই হয়ে ওঠে নিছক পরিসংখ্যান।

 

সীমান্তে প্রতিদিনের গুলিবর্ষণ শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়, মানবিক সংকটও। শিশুদের মৃত্যু, পরিবারগুলোর ভাঙন, আতঙ্কে বসবাস—সবই সমাজের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। সীমান্তের মানুষ মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা আর ভয় নিয়ে বেঁচে থাকে। অথচ রাজনীতি তাদের রক্তকে ব্যবহার করে কেবল ভারতবিরোধী আবেগ জিইয়ে রাখে।

 

বাংলাদেশের রাজনীতি যেন এক নাট্যমঞ্চ। এখানে ভারতবিরোধী আবেগ হলো প্রধান চরিত্র, আর মায়ানমারের রক্তক্ষয়ী সীমান্ত হলো নেপথ্য দৃশ্য। দর্শকরা হাততালি দেয় ভারতবিরোধী সংলাপে, কিন্তু আফনানদের মৃত্যুতে নীরব থাকে। রাজনীতির এই নাটকে সাধারণ মানুষ শুধু ক্রিড়ানক—তাদের রক্ত, তাদের মৃত্যু, তাদের দুর্ভাগ্যই হলো নাটকের উপকরণ।

 

বাংলাদেশের রাজনীতি যদি সত্যিই মানবিক হতো, তবে ফেলানী আর আফনানের মৃত্যু একইভাবে আলোড়ন তুলত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ভারতবিরোধী আবেগের নামে রাজনীতি শুধু ভণ্ডামির নগ্নচিত্র।

সব খবর

আরও পড়ুন

প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি, বাস্তবতার ঘাটতি

নির্বাচনী ইশতেহার প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি, বাস্তবতার ঘাটতি

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ ডা. জাহেদের

বিটিভিতে নাহিদ ইসলামের ভাষণ ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ ডা. জাহেদের

জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য সরকার গঠন করবে না বিএনপি

রয়টার্সকে তারেক রহমান জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য সরকার গঠন করবে না বিএনপি

সরাসরি কারচুপি নাওবা হয় যদি ডিজিটাল ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ বড় ঝুঁকি

ঢাবিতে ‘নির্বাচনী শুদ্ধতা’ সেমিনার সরাসরি কারচুপি নাওবা হয় যদি ডিজিটাল ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ বড় ঝুঁকি

আওয়ামী লীগকে বাদ দিলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে না

সিপিডি’র সতর্কবার্তা আওয়ামী লীগকে বাদ দিলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য হবে না

কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাদের মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হলেন রমেশ চন্দ্র সেন

প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতাদের মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হলেন রমেশ চন্দ্র সেন

টেকনাফে গুলিতে শিশুসহ ৫ আহত, গাজীপুরে সংঘর্ষ-ভাঙচুর

বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনী সহিংসতা টেকনাফে গুলিতে শিশুসহ ৫ আহত, গাজীপুরে সংঘর্ষ-ভাঙচুর

জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়া মুসলমানদের জন্য ‘জায়েজ নয়’

হেফাজতে ইসলামের আমির বাবুনগরী জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়া মুসলমানদের জন্য ‘জায়েজ নয়’