সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনসংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশকে ‘জাতির সঙ্গে প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের “অন্তহীন প্রতারণার দলিল” এবং এর কোনো সাংবিধানিক বৈধতা নেই। তিনি একই সঙ্গে সংবিধান সংশোধনের জন্য জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের নিয়ে একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ‘জুলাই সনদ’ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির এই আদেশটি অধ্যাদেশ বা আইন—কোনোটিই নয়, ফলে এটি সংসদে উপস্থাপনও করা হয়নি। তার ভাষায়, “১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করা হলেও এই আদেশটি সংসদের প্রথম দিনেই আনা হয়নি, কারণ এটি আইনগত কাঠামোর মধ্যে পড়ে না।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিও একটি “অবৈধ আদেশের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা প্রক্রিয়া”। তিনি বলেন, অসাংবিধানিক কোনো আদেশের মাধ্যমে কোনো বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
বিএনপির অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, দলটি ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ২০২৪ সালের ছাত্র-আন্দোলনে নিহতদের আকাঙ্ক্ষা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তারা দায়বদ্ধ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নির্বাচনি ইশতেহারের মাধ্যমে ৫১ শতাংশ জনগণের সমর্থন পেয়েছে এবং সেই ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে তারা সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংশোধন চায়। তিনি বলেন, “সরকারি দল, বিরোধী দল—সবার অংশগ্রহণে আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনতে চাই।”
এ লক্ষ্যে সংসদ নেতার পক্ষে তিনি একটি সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন, যেখানে সব দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই কমিটি আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধান সংশোধনী বিল প্রণয়ন করে সংসদে উত্থাপন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এ সময় সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানান।
রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন। কিন্তু “সংবিধান সংস্কার পরিষদ” নামে কোনো সাংবিধানিক সত্তা বিদ্যমান না থাকায় এর অধিবেশন আহ্বানের প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল প্রথম জাতীয় সংসদের বৈঠকের পর রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ক্ষমতা সীমিত করা হয়। সংবিধানের চতুর্থ তফসিল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি কোনো আদেশ বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতা খর্ব করতে পারেন না। “রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ—এটি সংবিধানের মৌলিক নীতি,” বলেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ এবং কার্যক্রম পরিচালনার কোনো বৈধ বিধান নেই। তবুও এ সংক্রান্ত শপথের ফর্ম সরবরাহ করা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংসদ সদস্যরাও। তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও সমালোচনা করে বলেন, এ ধরনের ফর্ম সরবরাহের কোনো আইনি এখতিয়ার কমিশনের নেই।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার মৌলিক সংবিধান সংশোধনের অধিকার রাখে না। “রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে আদেশ জারি করানো হয়েছে, যা সংবিধানের সীমা লঙ্ঘন করে,” দাবি করেন তিনি।
সবশেষে তিনি জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে সর্বদলীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান।