বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতার পরিবর্তনের পর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রবণতা নতুন নয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে হারে মামলা হয়েছে, তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে দলটির পক্ষ থেকে।
আওয়ামী লীগের দাবি, মাত্র ২০ মাসেই সারাদেশে তাদের লক্ষাধিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। যদিও এর সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশ করা হয়নি, দলটির নেতারা বলছেন—এসব মামলা পরিকল্পিত, প্রতিহিংসামূলক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
দলটির অভিযোগ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেই সাড়ে ৬০০-এর বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কয়েক লাখ নেতা-কর্মীকে মামলার আসামি করা হয়েছে, যাদের অনেকেই গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রায় ১০ হাজার নেতা-কর্মীর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না এবং কয়েক হাজার নিহত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
দলটির নেতারা আরও অভিযোগ করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীরা থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পর্যন্ত করতে পারছেন না। ফলে প্রকৃত তথ্য উঠে আসছে না। তাদের ভাষ্য, ভয় ও দমন-পীড়নের পরিবেশে পরিবারগুলোও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যেও রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সহিংসতায় অন্তত ১৯৫ জন নিহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এসব ঘটনার একটি বড় অংশই তাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার সঙ্গে জড়িত।
অন্যদিকে, বিএনপি তাদের শাসনামলে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর প্রসঙ্গ তুলে বলছে, ২০০৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলা হয়েছিল, যার বেশিরভাগই ‘মিথ্যা’ ছিল। তবে আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অতীতের তুলনা চলে না; এখনকার মামলা ‘সংখ্যা ও তীব্রতায়’ সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার।
পুলিশের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের এই অভিযোগকে ‘অবাস্তব’ বলা হলেও, দলটির দাবি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন এবং প্রকৃত চিত্র একদিন প্রকাশ পাবে।
আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজনৈতিক মামলার প্রকৃতি বা ‘মিথ্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করার কোনও আলাদা সরকারি পরিসংখ্যান নেই। এতে করে পুরো পরিস্থিতি আরও অস্বচ্ছ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা ও দমন-পীড়নের অভিযোগ দেশের বিচারব্যবস্থা, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।