১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নির্ধারণের কাজ স্বাধীনতার পর থেকে আজও শেষ হয়নি। একেক সরকারের আমলে তালিকায় নতুন নাম যুক্ত হয়েছে, আবার বাতিল হয়েছে কিছু নাম। কখনও আবার নতুন করে যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে।
রবিবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় আবারও যাচাই-বাছাইয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এতে মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—কতবার একজন মুক্তিযোদ্ধাকে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যাচাই-বাছাই কি কখনও শেষ হবে না।
স্বাধীনতার পর থেকে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও মানদণ্ড ১১ বার বদলানো হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে সাতবার। প্রথম তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৮৬ সালে, যেখানে এক লাখের বেশি নাম প্রকাশিত হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তালিকা সংশোধন ও সম্প্রসারণ করা হয়। ২০০২ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
গবেষক আহমেদ শরীফ বলেন, তালিকা করার সময় কখনও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি। বরং দলীয়করণ হয়েছে। তিনি মনে করেন, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করার পরিবর্তে বিরোধিতাকারীদের তালিকা করা উচিত ছিল। তার মতে, নতুন উদ্যোগে ভালো কিছু হবে কিনা, নাকি আবারও সুবিধাবাদীরা তালিকায় জায়গা করে নেবে, সেটাই দেখার বিষয়।
মানবাধিকার আন্দোলনের নেতা ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী বলেন, এত বছর পর নতুন তালিকা করা বা কাউকে বাদ দেওয়া মোটেই উচিত নয়। ক্ষমতায় আসা সরকার নিজেদের লোকদের সুযোগ-সুবিধা দিতে গিয়ে এ কাজ করে থাকে। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান হয়। তিনি বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া থাকতে পারে, যাতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বের হয়ে আসবে। তবে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাদের আলাদা করে দেখা উচিত নয়।
গবেষক ডা. এম হাসান বলেন, বিভিন্ন সময়ে দলীয় বিবেচনায় তালিকা তৈরি হয়েছে। যারা ট্রেনিং নিয়েছেন কিন্তু যুদ্ধ করেননি, তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন কিনা, সেটি নির্ধারণ করা জরুরি। সঠিকভাবে কাজটি করলে সত্য ইতিহাস বেরিয়ে আসবে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার রাজনৈতিক অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, তরুণ প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে না। মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, সেটি নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে। সভায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাই এবং সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।