ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তারেক রহমান তার পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেছেন। মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়ান। প্রধানমন্ত্রীসহ ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা. এর মধ্যে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী এবং অতিরিক্ত ১০ জন উপদেষ্টা (মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায়) মিলিয়ে মোট ৬০ সদস্যের এক বৃহৎ মন্ত্রীপরিষদীয় কাঠামো দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ মন্ত্রিসভা।
দায়িত্ব বণ্টনে বড় চমক
সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত এসেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। বিএনপির নেতা বা সংসদ সদস্য না হয়েও পেশাদার কূটনীতিক ড. খলিলুর রহমানকে টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে। কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের বার্তা দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী—এমনটাই দলীয় সূত্রের দাবি।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। অর্থ ও পরিকল্পনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী–কে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব পেয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ; হাফিজ উদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক; এবং এ জেড এম জাহিদ হোসেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে আছেন আব্দুল আউয়াল মিন্টু; ধর্ম মন্ত্রণালয়ে কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ; ভূমি মন্ত্রণালয়ে মিজানুর রহমান মিনু; সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে নিতাই রায় চৌধুরী।

বাণিজ্য, শিল্প ও বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় পেয়েছেন আরিফুল হক চৌধুরী। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে জহির উদ্দিন স্বপন। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়েছে টেকনোক্র্যাট মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিনকে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে আফরোজা খানম (রিতা); পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণে আসাদুল হাবিব দুলু; আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কে মো. আসাদুজ্জামান; গৃহায়ন ও গণপূর্তে জাকারিয়া তাহের; পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়কে দীপেন দেওয়ান।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পেয়েছেন আ ন ম এহছানুল হক মিলন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ফকির মাহবুব আনামের হাতে। সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌ মন্ত্রণালয় পেয়েছেন শেখ রবিউল আলম।
শরিক ও নতুন মুখদের অন্তর্ভুক্তি
শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ে জায়গা পেয়েছেন জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক নুর এবং ববি হাজ্জাজ। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে টেকনোক্র্যাট কোটায় সাবেক ফুটবলার মো. আমিনুল হককে নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে বেসামরিক বিমান, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, কৃষি, ভূমি, পানিসম্পদসহ বিভিন্ন খাতে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। নতুন ও পুরনো মুখের সমন্বয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য আনার চেষ্টা দৃশ্যমান।
প্রতিমন্ত্রীদের দায়িত্ব
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত; বাণিজ্য, শিল্প ও বস্ত্র ও পাটে মো. শরিফুল আলম; পররাষ্ট্রে শামা ওবায়েদ ইসলাম; কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ও খাদ্যে সুলতান সালাউদ্দিন টুকু; ভূমিতে কায়সার কামাল; পানি সম্পদে ফরহাদ হোসেন আজাদ; যুব ও ক্রীড়ায় টেকনোক্র্যাট মো. আমিনুল হক; পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।

সড়ক পরিবহন, রেলপথ ও নৌ পরিবহনে হাবিবুর রশিদ এবং মো. রাজীব আহসান; জনপ্রশাসনে মো. আব্দুল বারী; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়ে মীর শাহে আলম; অর্থ ও পরিকল্পনায় জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি); মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে ইশরাক হোসেন; মহিলা ও শিশু ও সমাজকল্যাণে ফারজানা শারমিন; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনে শেখ ফরিদুল ইসলাম; শ্রম ও কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণে নুরুল হক নুর; তথ্য ও সম্প্রচারে ইয়াসের খান চৌধুরী; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণে এম ইকবাল হোসেইন; স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণে এম এ মুহিত; গৃহায়ন ও গণপূর্তে আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর; শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় ববি হাজ্জাজ; সংস্কৃতি বিষয়ে আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম।
মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা (১০ জন)
মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হয়েছেন মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হয়েছেন হুমায়ুন কবির, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামসুল ইসলাম, ডা. জাহেদুর রহমান, ড. মাহাদি আমিন ও রেহান আসিফ আসাদ।
৬০ সদস্যের বিশাল কাঠামো নিয়ে আলোচনা
৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভার সঙ্গে ১০ জন উপদেষ্টা (৫ জন মন্ত্রী পদমর্যাদা, ৫ জন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) যুক্ত হওয়ায় মোট ৬০ সদস্যের মন্ত্রীপরিষদীয় কাঠামো গড়ে উঠেছে। উপদেষ্টাদের মধ্যে রয়েছেন মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ও ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ অন্যরা।
বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় মন্ত্রিসভা রাজনৈতিক ভারসাম্য ও দলীয় সমন্বয়ের বার্তা দিলেও প্রশাসনিক দক্ষতা ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। বাংলাদেশের ইতিহাসে তুলনামূলকভাবে এটি বড় আকারের মন্ত্রীপরিষদগুলোর একটি। কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে স্পষ্ট কাজের বণ্টন, সমন্বিত নীতি এবং জবাবদিহি কাঠামো জরুরি হবে।
প্রথম কর্মদিবসের সূচি
শপথের পরদিন সকালে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এরপর সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও সচিবদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবেন। বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ মন্ত্রিসভা বৈঠক।
নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা এবং বৈদেশিক সম্পর্ক—এই চারটি বড় চ্যালেঞ্জ। ৬০ সদস্যের বৃহৎ মন্ত্রীপরিষদ সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।