চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে—বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের এমন দাবি সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। শ্রমিক–কর্মচারীদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে কনটেইনার ও বাল্ক উভয় ধরনের পণ্য পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। জেটি, টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে কোথাও স্বাভাবিক অপারেশন চোখে পড়েনি।
রোববার দুপুরে বন্দর ভবনের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চেয়ারম্যান বলেন, “বন্দরের কাজ সচল আছে। কেউ কাজ করতে চাইলে বাধা নেই। কেউ বাধা দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে।” তিনি দাবি করেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে যোগ দিয়েছেন এবং যানবাহন চলাচলও স্বাভাবিক।
তবে সংবাদ সম্মেলনের কিছুক্ষণ পর বন্দর চার নম্বর গেট, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও আশপাশের ফটক ঘুরে দেখা যায়, কোনো পণ্যবাহী ট্রাক বা প্রাইম মুভারের চলাচল নেই। জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানামার কার্যক্রমও বন্ধ। সংশ্লিষ্টরা জানান, সকালবেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় সীমিত আকারে কাজ শুরুর চেষ্টা হলেও শ্রমিকরা যোগ না দেওয়ায় তা ব্যর্থ হয়। একটি জাহাজ থেকে কয়েকটি কনটেইনার নামানো হলেও সেটি ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ, নিয়মিত অপারেশন নয়।
শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের ভাষ্য, জেটির পাশাপাশি বহির্নোঙরেও বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। ফলে আমদানি-রপ্তানির প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বন্দরে সরবরাহ শৃঙ্খলে গুরুতর বিঘ্ন তৈরি হয়েছে।
এই কর্মবিরতির মূল কারণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা। এ প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, এখনো কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দর-কষাকষিও শেষ হয়নি। তবে শ্রমিকদের আশঙ্কা, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে টার্মিনাল গেলে চাকরি ও অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আন্দোলনের পটভূমিতে গত এক সপ্তাহ ধরে কর্মসূচি ধাপে ধাপে তীব্র হয়েছে। ৩১ জানুয়ারি থেকে প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে তিন দিন কর্মবিরতির পর মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মসূচি শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দিনের জন্য স্থগিত থাকলেও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ায় শনিবার থেকে আবার অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হয়।
শ্রমিকদের চার দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—এনসিটি বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা না দেওয়া, বন্দর চেয়ারম্যানকে প্রত্যাহার, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল এবং আন্দোলনের কারণে কোনো আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়া।
সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন অভিযোগ করেন, “আন্দোলন দমাতে বন্দর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আমাদের কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছে। শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজে যোগ দিচ্ছেন না।”
অন্যদিকে সরকার কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “কতিপয় লোক পুরো বন্দরকে জিম্মি করেছে। সামনে রমজান। নদীতে পড়ে আছে ছোলা, ডাল ও তেল। ১৮ কোটি মানুষকে জিম্মি করে ধর্মঘট চলতে দেওয়া যায় না। সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে।”
এরই মধ্যে আন্দোলনে জড়িত ১৫ কর্মচারীর বাসার বরাদ্দ বাতিল করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের প্রশাসন বিভাগ থেকে জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, তাদের মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগ না দেওয়ায় বাসা বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে। তালিকায় সংগ্রাম পরিষদের কয়েকজন শীর্ষ নেতাও রয়েছেন।
বন্দর চেয়ারম্যান অভিযোগ করেন, একটি পক্ষ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজান থাকায় সংকট তৈরি হলে দ্রব্যমূল্যে প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
তবে বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধাক্কা দেবে। কনটেইনার জট, জাহাজের অপেক্ষা, ডেমারেজ খরচ বৃদ্ধি এবং নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলে বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে প্রশাসনের ‘স্বাভাবিক’ দাবির বিপরীতে বাস্তবে চট্টগ্রাম বন্দর কার্যত স্থবির। শ্রমিক অসন্তোষ, ইজারা বিতর্ক ও সরকারের কঠোর অবস্থান—এই ত্রিমুখী সংকটে দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।