সর্বশেষ

শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে মেগা প্রকল্প অনুমোদন

ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন প্রকল্পে অন্তর্বর্তী সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে বিতর্ক

প্রকাশিত: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৪:৩৫
ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন প্রকল্পে অন্তর্বর্তী সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে বিতর্ক

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি একটি বৃহৎ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের সময় ঘোষণা করেছিলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ ছোট প্রকল্প নেওয়া হবে, মেগা প্রকল্প নয়। কিন্তু সেই ঘোষণার পরও একনেক সভায় একাধিক বড় প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। সর্বশেষ অনুমোদন পাওয়া ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রকল্পের বিপুল ব্যয় নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এত বড় অংকের প্রকল্প অনুমোদনকে অনেকেই বিতর্কিত বলে মনে করছেন।

 

বিশ্বের অন্যান্য দেশে একই সক্ষমতার রিফাইনারি নির্মাণে ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম। জাম্বিয়ায় চীনা কোম্পানি ফুজিয়ান শিয়াং শিন করপোরেশন ৬০ হাজার ব্যারেল সক্ষমতার একটি রিফাইনারি নির্মাণ করছে মাত্র ১.১ বিলিয়ন ডলারে। অ্যাঙ্গোলায়ও একই সক্ষমতার রিফাইনারি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। অথচ বাংলাদেশে একই সক্ষমতার প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২.৮৯ বিলিয়ন ডলার, যা আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় প্রায় ১৩৯ শতাংশ বেশি।

 

বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির দৈনিক সক্ষমতা ৩৩ হাজার ব্যারেল। আধুনিকায়ন শেষে ২০৩০ সাল নাগাদ সক্ষমতা দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ব্যারেল। অর্থাৎ অতিরিক্ত সক্ষমতা বাড়বে ৬৬ হাজার ব্যারেল। বার্ষিক উৎপাদন হবে প্রায় ৪৫ লাখ টন।

 

ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ হাজার কোটি টাকা। দীর্ঘ দেড় দশকেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়নি। পরবর্তী সময়ে ব্যয় বাড়িয়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। বিদেশী ঋণ না পাওয়ায় প্রকল্পের অগ্রগতি হয়নি। ২০২২ সালে বিপিসি নিজস্ব অর্থায়নে কাজ এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়, তখন ব্যয় দাঁড়ায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। এরপরও কাজ শুরু হয়নি। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে স্থানীয় বেসরকারি কোম্পানি ২৫ হাজার কোটি টাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগ্রহ প্রকাশ করে। তবে আগস্টে দাঙ্গার পর প্রকল্প স্থগিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে পুনরায় উদ্যোগ নেয় এবং সর্বশেষ ব্যয় দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা।

 

প্রকল্পের নকশা তৈরিতে ফ্রান্সের কোম্পানি টেকনিপ এবং প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট হিসেবে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের পেছনে বিপিসি ইতিমধ্যেই প্রায় ১,১০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। অভিযোগ রয়েছে, আগের সরকার বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রকল্পে ঢিলেমি করেছে।

 

পরিকল্পনা কমিশন বলছে, বিশ্ব যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে, তখন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কমিশনের মতে, কোন ধরনের ক্রুড অয়েল ব্যবহার করা হবে এবং বাজারে এর চাহিদা কতটুকু থাকবে, তা স্পষ্ট নয়। প্রকল্পে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে থোক বরাদ্দ হিসেবে ১১ হাজার কোটি টাকার প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা আরও পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা দরকার।

 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিফাইনারি নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও এর ব্যবহার পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। ইস্টার্ন রিফাইনারি ৪০ শতাংশ ডিজেল উৎপাদন করবে, বাকি ৬০ শতাংশ হবে পেট্রল, অকটেন ও জেট ফুয়েল। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই পেট্রল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদিত পেট্রলের বাজার তৈরি না হলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

 

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, “ডিজেলের চাহিদা বিবেচনায় রিফাইনারি প্রয়োজন রয়েছে। তবে অন্যান্য পণ্যের বাজার তৈরি না হলে প্রকল্পটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।”

 

বিপিসির চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান বলেন, “রিফাইনারি নির্মাণ ব্যয় আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেশি দেখাচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ব্যয় কমানো সম্ভব।”

 

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার ছিল ৬৭ লাখ টন। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারি উৎপাদন করেছে মাত্র ১২ লাখ ৫০ হাজার টন। বাকি প্রায় ৫০ লাখ টন আমদানি করতে হয়েছে। বিপিসির প্রাক্কলন অনুসারে, ২০২৯-৩০ অর্থবছরে চাহিদা দাঁড়াবে ১ কোটি ৭ লাখ টন।

 

ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন প্রকল্প অনুমোদন পেলেও এর অতিরিক্ত ব্যয়, আন্তর্জাতিক তুলনায় অস্বাভাবিক খরচ এবং জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অবকাঠামো সম্প্রসারণের যৌক্তিকতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে, তবে বাজার ও ব্যবহার নিশ্চিত না হলে এটি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সব খবর

আরও পড়ুন

আনন্দের আবহে উৎসব, বৃষ্টির শঙ্কা ও বাড়তি নিরাপত্তা

আজ ঈদুল ফিতর আনন্দের আবহে উৎসব, বৃষ্টির শঙ্কা ও বাড়তি নিরাপত্তা

এলএনজি সরবরাহেও যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই ঝুঁকছে বাংলাদেশ

গ্যাস খাতে মার্কিন প্রভাব বাড়ছে এলএনজি সরবরাহেও যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই ঝুঁকছে বাংলাদেশ

তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে স্থলভাগ ও সাগরে আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রস্তুতি

১৮০ দিনের পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে স্থলভাগ ও সাগরে আন্তর্জাতিক দরপত্রের প্রস্তুতি

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী আজ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী আজ

ভারতের আধার কার্ডের আদলে দেশে আসতে পারে ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’

ভারতের আধার কার্ডের আদলে দেশে আসতে পারে ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’

সরকারের ভেতরে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি ঠেকাতে পারিনি

গোলটেবিল বৈঠকে ফরিদা আখতার সরকারের ভেতরে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি ঠেকাতে পারিনি

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানে অনুদানের নামে দুর্নীতি উপদেষ্টা ফারুকীর

মানবজমিনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানে অনুদানের নামে দুর্নীতি উপদেষ্টা ফারুকীর

বিকল্প উৎসের খোঁজে মরিয়া সরকার

জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা বিকল্প উৎসের খোঁজে মরিয়া সরকার