মানুষের বাসায় কাজ করেছেন। ৫ টাকা বেতন। দুইবেলা না খেয়ে থেকে খেটেছেন। মাস শেষে বেতনের টাকা পান নাই।
চায়ের দোকানের কর্মচারি ছিলেন। ৭ টাকা বেতনের চাকরি। পেটেভাতে হয়ে গিয়েছিল শুধু। দোকানদার বেতনের একটা টাকাও দেয় নাই।
মন্দিরের চাতালে থেকেছেন। অভূক্ত থেকেছেন।
মাটিকাটার শ্রমিক হয়েছেন। মজুরি এক টাকা বারো আনা দৈনিক। কিন্তু সবদিন কাজ মেলে না।
মেসের বাবুর্চিগিরি করেছেন। ১৫ টাকা বেতন।
আইসক্রিমওয়ালা ছিলেন কিছুদিন, ফলওয়ালা ছিলেন কিছুদিন। অভাবের পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরতে পারেন নাই।
আবার কাজ নিয়েছেন মানুষের বাসায়, আবার ঠকেছেন।
শেষে একটা চাকরি পেয়েছিলেন। ৩৭ বছর সেই চাকরি করেছেন। সংগ্রামমুখর এই জীবন সুকুমার বড়ুয়ার। বাংলাদেশের ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া। ১৯৩৮-২০২৬।
অল্পকিছু গদ্য রচনা করেছেন, গল্প ও প্রবন্ধ লিখেছেন, কিন্তু সুকুমার বড়ুয়াকে আমরা মনে রাখব তাঁর অসামান্য ছড়া সম্ভারের প্রসাদগুনেই, একথা বলাই বাহুল্য। সম্পূর্ণ ছড়াকার, আপাদমস্তক ছড়াকার, প্রকৃত ছড়াকার, শুদ্ধতম ছড়াকার একজন সুকুমার বড়ুয়া।
ছড়া প্রাণ থেকে আসে, না হলে হয় না। প্রাণে ছড়া ছিল সুকুমার বড়ুয়ার, এজন্য শত দুঃখ শত কষ্টের মধ্যেও ছড়া ছাড়েননি বা ধরেননি বলার উপায় নাই, ছড়া সব সময় ছিল তাঁর সঙ্গে। প্রথম প্রকাশিত বই ‘পাগলা ঘোড়া।’ বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে ‘ভিজে বেড়াল’, ‘চিচিং ফাঁক’ ‘আরো আছে’, ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’, ‘কিছু না কিছু’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘নদীর খেলা, ‘এলোপাথাড়ি’ ইত্যাদি প্রায় ২০টার মতো বই প্রকাশিত হয়েছে।
চট্টগ্রামের রাউজান থানার মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে জন্মেছিলেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় একটা ছড়ার বই লিখেছেন, ‘কোয়াল খাইয়ে।’ ছড়া লিখে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন— বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার। আরো অসংখ্য পদক পুরস্কার পেয়েছেন। আর পেয়েছেন ভালোবাসা। বাংলা ভাষাভাষী গ্লোবাল ভিলেজের মানুষ, যারা বই পড়েন, যে কোনো বয়সী, ছড়া পড়েন, সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া তারা ভালোবেসে পড়েছেন, পড়েন ও পড়বেন।
সারাজীবন ছড়া লিখেছেন। কত ছড়া? শিশু সাহিত্যিক সুজন বড়ুয়াকে এক সাক্ষাৎকারে সুকুমার বড়ুয়া বলেছেন, দুই হাজারের মতো হবে। শিশু সাহিত্যের উৎকর্ষধর্মী সাময়িকী ‘শিশুসাহিত্য সারথি’-তে সেই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে।
সুকুমার বড়ুয়ার ছড়ার ভালোমন্দ নাই। সব ছড়াই ভালো ছড়া। প্রাণে বাজে। ‘আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি’র মতো বাজে। যখন তখন। শুধু ছড়া লিখে সুকুমার বড়ুয়া চিরস্মরণীয় হয়ে থাকলেন।