বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এক কংগ্রেসনাল ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে আয়োজন করা ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ সরাসরি বলেছেন, দেশের সবচেয়ে পুরনো ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে যে ভোট আয়োজন করা হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
সোমবার ক্যাপিটল হিলে ‘বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা’ শীর্ষক এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে ‘হিন্দুঅ্যাকশন’ ও ‘কোয়ালিশন অব হিন্দুজ অব নর্থ আমেরিকা’। এতে মার্কিন কংগ্রেস সদস্য, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশি প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল রুবিন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ধর্মের আড়ালে রাজনৈতিক সহিংসতা ও দুর্নীতি ঢাকার চেষ্টা করছে দলটি। তার দাবি, “১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের কোনো প্রকৃত গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।”
রুবিন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কঠোর সমালোচনা করে তাকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ‘দুশমন’ বলেও অভিহিত করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও অগ্রহণযোগ্য।
রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান টম ব্যারেট বলেন, “ইসলামিক চরমপন্থা বিভিন্ন দেশে অস্থিরতা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র মানবতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় সোচ্চার থাকবে।” তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান সুহাস সুব্রমনিয়ম বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “সবচেয়ে পুরনো এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে যে নির্বাচনের চেষ্টা চলছে, তা ঠিক হচ্ছে না। এ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধই থাকবে।” তার মতে, শুধু বক্তব্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রকে বাস্তব পদক্ষেপও নিতে হবে।
ব্রিফিংয়ে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক সাবেক অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ স্যামুয়েল ব্রাউনব্যাক। তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভেঙে পড়লে শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনীতি ও গণতন্ত্র—সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি তুলে ধরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “প্রায় ৩০০ সাংবাদিককে হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।” তিনি আটক সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি জানান।
সাউথ এশিয়ান মাইনোরিটিজ কালেক্টিভের প্রেসিডেন্ট প্রিয়া সাহা অভিযোগ করেন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।
ব্রিফিংয়ে আরও বক্তব্য দেন বিভিন্ন থিংক ট্যাংক প্রতিনিধি, প্রবাসী সংগঠক ও গবেষকরা। নিউ জার্সির সিনেটর কোরি বুকার, ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান মাইক লেভিন ও ইয়ং কিমসহ কয়েকজন আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে, এই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, মানবাধিকার পরিস্থিতি ও ইসলামপন্থী রাজনীতির উত্থান—এই চারটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। অংশগ্রহণকারীদের মতে, অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ছাড়া বাংলাদেশের গণতন্ত্র আন্তর্জাতিক মহলে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে পারে।